ফরজ ওয়াজিব সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আদায় করার পর বাকি সব আমল না করলে সম্পদ এবং সন্তানের ফিতনা হবেকি। কারন হালাল ইনকাম করতে গেলে বাকি ইবাদাত করতে বেশী কষ্ট হতে পারে আবার সব সময় করা হয়ে উঠবেনা।নফল নামাজ এবং সুন্নাতে জায়েদা নামাজ পড়া প্রতিদিন সম্ভব না মাঝে মধ্যে পরা হতে পারে। মাসনুন দোয়া করা হতে পারে জিকির ইস্তিগফার করা হতে পারে।হালাল রিজিকের চেষ্টা করা হালাল ইনকাম করা একটা ইবাদাত উপরের বিষয় কি পরকালীন পাথেয় সংগ্রহ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে ?
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। ifatwa.info অনুযায়ী হানাফি মাযহাবের সংক্ষিপ্ত উত্তর এবং একটি রেফারেন্স সহ নিচে দেওয়া হলো:
না, ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আদায় করার পর হালাল উপার্জনে মনোযোগ দেওয়া সম্পদ ও সন্তানের ফিতনার কারণ হবে না, যদি আপনি তাদের হক (অধিকার) সঠিকভাবে আদায় করেন। এটি পরকালীন পাথেয় সংগ্রহে সরাসরি প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করবে না, তবে আপনার পাথেয়ের পরিমাণ সীমিত হতে পারে এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের উচ্চতর সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।
বিশ্লেষণ:
1. ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা: এগুলি দ্বীনের সর্বনিম্ন ও অপরিহার্য অংশ। ফরজ ও ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়া কবীরা গুনাহ। সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া নিন্দনীয় এবং এতে বড় সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়, যা পরকালীন পাথেয়ের মূল ভিত্তি।
2. হালাল উপার্জন: এটি নিজেই একটি বড় ইবাদত। নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য হালাল রুজি অন্বেষণ করা ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজের পর একটি ফরজ।" (শু'আবুল ঈমান, বায়হাক্বী)। এটি আপনাকে মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে বাঁচায় এবং এর মাধ্যমে আপনি যাকাত, সাদাকা ও অন্যান্য আর্থিক ইবাদত করতে সক্ষম হন। সুতরাং, হালাল উপার্জন কখনোই ফিতনা বা পাথেয় সংগ্রহের প্রতিবন্ধক নয়, বরং এটি পাথেয় সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
3. নফল ও সুন্নাতে জায়েদা (গাইরে মুয়াক্কাদা): এগুলি অতিরিক্ত ইবাদত। এগুলি করলে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ হয়, মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং ফরজের ঘাটতি পূরণ হয়। এগুলি ছেড়ে দিলে গুনাহ হয় না, তবে বিপুল পরিমাণ সওয়াব ও আল্লাহ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হওয়া যায়। দৈনন্দিন জীবনে সময়ের অভাবে যদি সব নফল ও সুন্নাতে জায়েদা পালন করা সম্ভব না হয়, তবুও মাঝে মাঝে বা যতটুকু সম্ভব পালন করার চেষ্টা করা উচিত।
4. মাসনুন দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার: এগুলি খুবই বরকতপূর্ণ ইবাদত। এগুলি নিয়মিত করার চেষ্টা করা উচিত। এগুলো করতে খুব বেশি সময় লাগে না এবং কাজের ফাঁকেও করা যায়। এগুলি আত্মাকে সতেজ রাখে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে।
5. সম্পদ ও সন্তানের ফিতনা: সম্পদ ও সন্তান তখনই ফিতনা হয় যখন মানুষ আল্লাহর হক ভুলে যায়, হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়, সন্তানের সঠিক তারবিয়াত (প্রতিপালন) করে না, বা সম্পদের মোহে আখিরাতকে ভুলে যায়। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে যদি তার হক আদায় করা হয় এবং সন্তানদের দ্বীনি তারবিয়াত দেওয়া হয়, তবে তারা ফিতনা নয়, বরং রহমত ও সাদকায়ে জারিয়া হতে পারে।
পরকালীন পাথেয়:
ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পালন করলে এবং হালাল উপার্জন করলে পরকালীন পাথেয় অবশ্যই সংগৃহীত হবে। তবে নফল ইবাদত, সুন্নাতে জায়েদা, অতিরিক্ত জিকির-আজকার, দোয়া-ইস্তিগফার ইত্যাদি দ্বারা এই পাথেয়ের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায় এবং বান্দা আল্লাহ তা'আলার আরও বেশি নৈকট্য লাভ করে। এগুলি ছেড়ে দিলে আপনি জাহান্নামে যাবেন না, কিন্তু জান্নাতে আপনার মর্যাদা এবং পুরস্কারের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
উপসংহার:
আপনার প্রধান মনোযোগ ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদার উপর থাকা চাই এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করাও আপনার জন্য ইবাদত। এর পাশাপাশি, যতটুকু সম্ভব নফল ইবাদত, মাসনুন দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার করার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। আপনার আন্তরিকতা ও চেষ্টা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে ইন শা আল্লাহ।
রেফারেন্স:
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "إن الله قال: من عادى لي وليا فقد آذنته بالحرب، وما تقرب إلي عبدي بشيء أحب إلي مما افترضت عليه، وما يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته: كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، وإن سألني لأعطينه، ولئن استعاذني لأعيذنه."
অনুবাদ:
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর (বন্ধুর) সাথে শত্রুতা করল, আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আর আমার বান্দা ফরয দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে যা আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। এবং আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে; এবং তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তবে আমি তাকে অবশ্যই তা দেই। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দেই।"
(সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদিস নং: ৬৫০২)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ফরজ ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য লাভের মূল ভিত্তি, আর নফল ইবাদত সেই নৈকট্যকে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করে তোলে। তাই সাধ্যমতো নফল ইবাদতও বর্জন না করার চেষ্টা করা উচিত।