আমি বিবাহিত বাংলাদেশের মেয়েরা দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায় না যদি কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক করে নিজের বিয়ের কথা গোপন করে দেখা করার কথা বলে নিয়ে এসে আমি কয়েকজন লোক আমি রেডি করে রাখি যে আমাদের ধরে বিয়ে পরিয়ে দিবে মেয়েকে ভয় দেখিয়ে যেভাবেই হোক মুখ দিয়ে উচ্চারণ করানো হলো এরকম করলে কোন ধরনের গুনাহ হবে বিবাহ হয়ে যাবে কি
এই ধরণের কাজ ইসলামে জঘন্যতম গুনাহ এবং এটি দ্বারা কোনো valid বিবাহ সম্পন্ন হবে না। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
1. জঘন্যতম গুনাহ (Sin):
আপনার বর্ণিত পদ্ধতিটি অসংখ্য বড় গুনাহের সমষ্টি:
* ধোঁকা ও মিথ্যাচার: নিজের বিবাহিত অবস্থা গোপন করে সম্পর্ক করা এবং মিথ্যা বলে মেয়েটিকে ডেকে আনা সুস্পষ্ট হারাম ও ধোঁকা। ইসলামে মিথ্যা ও ধোঁকা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।
* জোর-জবরদস্তি ও জুলুম (Coercion and Oppression): ভয় দেখিয়ে বা চাপ সৃষ্টি করে কাউকে বিবাহে বাধ্য করা চরম জুলুম। ইসলামে জোরপূর্বক বিবাহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং এটি নারীর মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
* সম্মানহানি ও মানসিক নির্যাতন: এমন পরিস্থিতিতে ফেলে একটি মেয়ের সম্মানহানি করা এবং তাকে মানসিক যন্ত্রণার শিকার বানানো গুরুতর অপরাধ।
* অসৎ উদ্দেশ্য ও ষড়যন্ত্র: এই পুরো পরিকল্পনাটিই একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্য এবং ষড়যন্ত্রের অংশ।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না..." (সূরা নিসা, ৪:২৯)। যদিও এখানে সম্পত্তির কথা বলা হয়েছে, তবে এর ব্যাপ্তি বিস্তৃত। অন্যায়ভাবে কারো অধিকার হরণ করা বা তার সাথে প্রতারণা করা এর অন্তর্ভুক্ত। নারীর সম্মতি ও অধিকার হরণ করা এক ধরনের অন্যায় ভক্ষণ।
2. বিবাহের বৈধতা (Validity of Marriage):
আপনার বর্ণিত পন্থায় কোনো valid বিবাহ সম্পন্ন হবে না, যদিও হানাফী মাযহাবে 'ইকরাহ' (জোর-জবরদস্তি) এর ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন মত আছে।
* হানাফী মাযহাবের মূলনীতি: হানাফী মাযহাবের একটি বিশেষ মত হলো, যদি কাউকে বিবাহের ইজাব (প্রস্তাব) বা কবুল (গ্রহণ) বলতে বাধ্য করা হয় এবং সে মুখে তা উচ্চারণ করে, তাহলে বাহ্যিকভাবে সেই বিবাহ সহীহ হয়ে যায়, যদিও জোরকারী গুনাহগার হবে। তবে, এই মতটি সাধারণত এমন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কেবল কথার উপর চাপ থাকে, কিন্তু মনের সন্তুষ্টি না থাকলেও বাহ্যিকভাবে চুক্তি সম্পন্ন হয়।
* আপনার বর্ণিত পরিস্থিতির বিশ্লেষণ: কিন্তু আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিটি কেবল মুখের কথার উপর চাপানো 'ইকরাহ' এর চেয়েও গুরুতর:
* প্রতারণা (Deception): শুরুতেই নিজের বিবাহিত পরিচয় গোপন করা বিবাহের একটি মৌলিক শর্ত (মুক্ত ও অবগত সম্মতি) লঙ্ঘন করে। যে নারী বিবাহিত পুরুষকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নন, তাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে 'সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সম্মতি' অনুপস্থিত।
* চরম জবরদস্তি: "ভয় দেখিয়ে যেভাবেই হোক মুখ দিয়ে উচ্চারণ করানো হলো" - এর অর্থ হলো সেখানে প্রকৃত কোনো সম্মতি (রিযা) ছিল না, বরং ভয় ও ত্রাসের কারণে বাক্য উচ্চারণ করা হয়েছে। বিবাহ সহীহ হওয়ার জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের পক্ষ থেকে স্বাধীন ও স্বেচ্ছামূলক সম্মতি (ইজাব ও কবুল) আবশ্যক। এটি না থাকলে বিবাহ বাতিল।
* প্রকৃত ইচ্ছার অনুপস্থিতি: এমনকি হানাফী ফকীহগণও স্বীকার করেন যে, ইকরাহকারীর জন্য জোরপূর্বক বিবাহ করা হারাম, যদিও বাহ্যিকভাবে চুক্তিটি সহীহ হতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রতারণা, মিথ্যা এবং এতটা চরম মানসিক চাপ ও ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে যে, ব্যক্তির প্রকৃত ইচ্ছাই প্রকাশিত হয়নি, সেখানে এই ধরনের বিবাহকে সহীহ বলা কঠিন। আধুনিক হানাফী স্কলাররা এবং ফতোয়া বোর্ডগুলো এমন পরিস্থিতিতে বিবাহকে বাতিল গণ্য করেন, কারণ এখানে "رضا" (সন্তুষ্টি বা স্বাধীন সম্মতি) একেবারেই অনুপস্থিত।
* ফতোয়া আল-হিন্দিয়্যাহ (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি) অনুসারে: হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ 'আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহ' (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি) তে বলা হয়েছে, "إذا أكرهت المرأة على النكاح فتزوجت فالنكاح صحيح، ويكون المكره آثمًا" (যদি কোনো মহিলাকে বিবাহে বাধ্য করা হয় এবং সে বিবাহ করে, তাহলে বিবাহ সহীহ হবে এবং জোরকারী গুনাহগার হবে)।
* তবে এই মতের প্রয়োগ আপনার ক্ষেত্রে নয়: এই মতটি সাধারণত এমন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কেবল 'চাপ' প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে রয়েছে চরম প্রতারণা (ধোঁকা) এবং এমন ভয়ভীতি প্রদর্শন যা একজন ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তাভাবনার ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নেয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, প্রকৃত 'কবুল' (গ্রহণ) কখনোই সম্পন্ন হয় না, কারণ এটি ভয় ও হুমকির মুখে দেওয়া একটি বাক্য মাত্র, প্রকৃত সম্মতি নয়।
উপসংহার:
আপনার বর্ণিত কাজটি ইসলামে মারাত্মক হারাম ও জঘন্যতম গুনাহ। এটি প্রতারণা, জুলুম ও নারীর অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এই পন্থায় অর্জিত তথাকথিত 'বিবাহ' ইসলামের দৃষ্টিতে মোটেও বৈধ হবে না (বাতিল)। যদি এরপরে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তবে তা যিনা (অবৈধ সম্পর্ক) হিসেবে গণ্য হবে।
আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং এই ধরনের অন্যায় ও হারাম কাজ থেকে বিরত থাকুন। বিবাহ একটি পবিত্র সম্পর্ক যা সততা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক স্বাধীন সম্মতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।