কেউ যদি কোন এক সময় কিনায়া তালাকের কথা বলে নিয়ত ও থাকে। কিন্তু এখন নিয়িত কিছুতেই মনে করতে পারছে না। তাইলে তখন তো তালাক হয়ে গেছিলো সেই গুনাহ কি হইতে থাকবে?
ইফাতওয়া.ইনফো এবং হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, আপনার প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
যদি কেউ কিনায়া (পরোক্ষ) তালাকের শব্দ ব্যবহার করে থাকে এবং সেই মুহূর্তে তার তালাকের নিয়তও ছিল বলে ধারণা করে, কিন্তু বর্তমানে সে নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারছে না যে তার তালাকের নিয়ত ছিল কিনা, তাহলে
বিবাহ বন্ধন অক্ষত বলে গণ্য হবে এবং তালাক হয়নি ধরা হবে। অতএব, সেই গুনাহ (অবৈধভাবে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার) চলতে থাকবে না।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১.
কিনায়া তালাক ও নিয়ত: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, কিনায়া (পরোক্ষ) তালাক যেমন: "তুমি মুক্ত", "তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও", "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম" ইত্যাদি শব্দ দ্বারা তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য
বলার সময় তালাকের সুস্পষ্ট নিয়ত (উদ্দেশ্য) থাকা আবশ্যক। নিয়ত না থাকলে কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক হয় না।
২.
সন্দেহ ও মূলনীতি: ইসলামি ফিকহের একটি মৌলিক মূলনীতি হলো:
"الْيَقِينُ لَا يُزَالُ بِالشَّكِّ" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূরীভূত হয় না)। এই মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো বিষয়ের মূল অবস্থা (আস্ল) যদি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত থাকে, তাহলে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে সেই মূল অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না। বিবাহের ক্ষেত্রে মূল অবস্থা হলো বিবাহ বন্ধন বহাল থাকা। তালাক হলো এমন একটি বিষয় যা এই মূল অবস্থাকে পরিবর্তন করে। তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ বা নিশ্চিত শর্ত (যেমন কিনায়ার ক্ষেত্রে নিয়ত) থাকা জরুরি।
৩.
নিয়ত ভুলে গেলে: প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনি নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারছেন না যে আপনার তালাকের নিয়ত ছিল কিনা, তাই এখানে তালাক সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেল। কিন্তু বিবাহ বন্ধন বহাল থাকার বিষয়টি ছিল একটি নিশ্চিত মূল অবস্থা। যেহেতু তালাক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়, তাই মূল অবস্থা (বিবাহ বহাল থাকা) বজায় থাকবে।
৪.
গুনাহের প্রশ্ন: যেহেতু ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার বিবাহ বন্ধন অক্ষত বলে গণ্য হচ্ছে এবং তালাক হয়নি, তাই আপনার দাম্পত্য সম্পর্ক অবৈধ হচ্ছে না। অতএব,
অবৈধভাবে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো গুনাহ (যেমন ব্যভিচারের গুনাহ) আপনার উপর বর্তাবে না। যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারছেন যে আপনার তালাকের নিয়ত ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার স্ত্রীকে আপনার স্ত্রী হিসেবেই গণ্য করতে পারবেন।
তবে সতর্কতা হিসেবে:
যদি আপনার মনে পরবর্তীতে কখনো নিশ্চিতভাবে মনে পড়ে যায় যে আপনার তালাকের নিয়ত ছিল, তাহলে তখন থেকে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে এবং আপনাকে তৎক্ষণাৎ শরিয়ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এমতাবস্থায়, যদি আপনি চান, তাহলে নিশ্চিত থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতের কোনো সন্দেহ এড়ানোর জন্য নতুন করে তালাকের নিয়তে "এক তালাক" দিয়ে দিতে পারেন, যা 'তালাকে রাজঈ' (প্রত্যাবর্তনযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। এর ইদ্দতের মধ্যে আপনি চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।
১ রেফারেন্স সহ:
এই মাসআলাটি হানাফি ফিকহের মৌলিক গ্রন্থাদিতে উল্লিখিত "الْيَقِينُ لَا يُزَالُ بِالشَّكِّ" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূরীভূত হয় না) নীতির উপর ভিত্তি করে।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া), কিতাবুত তালাক, বাবুল কিনায়াত: এই গ্রন্থে তালাকের কিনায়া শব্দের ব্যবহার এবং নিয়তের শর্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিনায়ার ক্ষেত্রে তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক হয় না। যখন নিয়ত স্মরণ না থাকার কারণে সন্দেহ দেখা দেয়, তখন নিশ্চিতভাবে তালাক প্রমাণিত না হওয়ায় বিবাহ বহাল থাকে।
* "(وَشَرْطُ وُقُوعِهِ النِّيَّةُ أَوْ دَلَالَةُ الْحَالِ)... وَلَوْ نَوَى الطَّلَاقَ ثُمَّ شَكَّ فِي النِّيَّةِ لَا يَقَعُ؛ لِأَنَّ الشَّكَّ لَا يَزِيلُ الْيَقِينَ." (যদি তালাকের নিয়ত করার পর নিয়ত সম্পর্কে সন্দেহ হয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না; কারণ সন্দেহ নিশ্চিতকে দূর করে না।) - এটি একটি প্রাসঙ্গিক ফিকহী উক্তি যা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সুতরাং, আপনার বর্তমান অবস্থায় কোনো গুনাহ হচ্ছে না এবং আপনার বিবাহ বহাল আছে।