মুফতি ওয়ালীউল্লাহ এক ফতোয়ার উত্তরে বলেছে মনে মনে ঠোট জিহবা নাড়িয়ে তালাক এর শব্দ শুনলে এত টুকু আওয়াজ হওয়া চাই যখন ফ্যান বা অন্য আওয়াজ না থাকলে কানে আসতো। এখন আমি তো অনেক একবারে লাস্ট টাইপের আওয়াজ করলেও কানে শুনতে পাই। তাইলে কানে আসবে না ওই আওয়াজ কোনটা। ভাই তুমি কথা বুঝো নাই আমি বলছি আমি একবারে লাস্ট যে আওয়াজ শুনি সেটা ফ্যান থাকলেও শুনি।
আপনার প্রশ্ন এবং মুফতি ওয়ালীউল্লাহ সাহেবের ফতোয়ার মূল বিষয়বস্তু সঠিক। ifatwa.info তে মুফতি ওয়ালীউল্লাহ সাহেব যেই শর্তের কথা বলেছেন, তা হানাফি ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মাসআলারই একটি ব্যাখ্যা।
মুফতি ওয়ালীউল্লাহ সাহেবের ফতোয়ার ব্যাখ্যা:
তিনি বলতে চেয়েছেন, তালাক (বা অন্য যেকোনো কথা যেমন শপথ, চুক্তি ইত্যাদি) কার্যকর হওয়ার জন্য শুধু মনে মনে চিন্তা করা বা ঠোঁট-জিহ্বা নাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং,
শারীরিকভাবে শব্দ উৎপাদন হওয়া আবশ্যক। এই 'শব্দ উৎপাদন' এর সর্বনিম্ন মাত্রা হলো, যদি আশেপাশে কোনো কোলাহল (যেমন ফ্যানের শব্দ, গাড়ির শব্দ, মানুষের কোলাহল) না থাকতো, তাহলে উক্ত ব্যক্তি তার নিজের কানে সেই শব্দ শুনতে পেতো।
আপনার পরিস্থিতি এবং "কানে আসবে না ওই আওয়াজ কোনটা" এর উত্তর:
আপনার কথা একদম পরিষ্কার বোঝা গেছে। আপনি বলছেন আপনার শ্রবণশক্তি এত ভালো যে, আপনি "একবারে লাস্ট যে আওয়াজ" (যেমন, খুবই ক্ষীণ ফিসফিসানি) করেন, সেটা ফ্যান থাকা সত্ত্বেও শুনতে পান।
এই ক্ষেত্রে, মুফতি ওয়ালীউল্লাহ সাহেবের ফতোয়ার উদ্দেশ্যকে এভাবে বুঝতে হবে:
1.
যদি আপনি *আসলেই শব্দ উৎপাদন* করেন:
আপনার ক্ষেত্রে যদি আপনি 'একবারে লাস্ট টাইপের আওয়াজ' (যেমন, খুবই ক্ষীণ ফিসফিসানি) ফ্যানের শব্দ থাকা সত্ত্বেও শুনতে পান, তাহলে বুঝতে হবে যে আপনি
আসলেই শব্দ উৎপাদন করছেন, যদিও তা খুবই মৃদু। ফ্যান না থাকলে যেই শব্দ আপনি শুনতে পেতেন, যদি আপনি সেই শব্দ ফ্যান থাকা সত্ত্বেও আপনার অসাধারণ শ্রবণশক্তির কারণে শুনতে পান, তবে
তালাক কার্যকর হবে, কারণ শব্দ উৎপন্ন হয়েছে এবং আপনি নিজেই তা শুনতে পাচ্ছেন।
2.
কানে আসবে না ওই আওয়াজ কোনটা (অর্থাৎ, তালাক কার্যকর হবে না এমন পরিস্থিতি):
যে আওয়াজ কানে আসতো না এবং যার কারণে তালাক কার্যকর হতো না, সেটি হলো এমন অবস্থা যখন
কোনো শব্দই উৎপন্ন হয়নি, শুধু ঠোঁট-জিহ্বা নড়েছে। অর্থাৎ, বাতাসকে কাঁপিয়ে কোনো শব্দ তরঙ্গ তৈরি হয়নি। এটি শুধুমাত্র আপনার মস্তিষ্কের ভেতরের অনুভূতি, শব্দের নয়।
সহজভাবে বলতে গেলে:
*
তালাক কার্যকর (যদি শব্দ হয়): আপনি মুখে 'তালাক' শব্দটি ফিসফিস করে এমনভাবে বললেন, যাতে আপনার নিজের কানে সেই ফিসফিসানির একটি মৃদু আভাস (হিন্ট) আসে, ফ্যান না থাকলে। আপনার যদি খুব ভালো শ্রবণশক্তি থাকে এবং আপনি ফ্যানের শব্দের মধ্যেও সেই মৃদু ফিসফিসানির
শব্দ শুনতে পান, তাহলে তা কার্যকর হবে।
*
তালাক কার্যকর নয় (যদি শব্দ না হয়): আপনি শুধু মনে মনে তালাকের কথা ভাবলেন, ঠোঁট-জিহ্বা শুধু নাড়ালেন কিন্তু
কোনো শব্দই বের হলো না, এমনকি ফিসফিসানির মতোও না, যা আপনার নিজের কানেও আসতো না যদি ফ্যান না থাকতো। এটি শুধুমাত্র আপনার মনের চিন্তা, শব্দ নয়।
সারসংক্ষেপ:
মূল পার্থক্য হলো
শারীরিক শব্দ উৎপাদন (যদিও তা অত্যন্ত মৃদু) এবং
শুধু মনে মনে উচ্চারণ বা ঠোঁট-জিহ্বার নড়াচড়া কিন্তু কোনো শব্দ উৎপাদন না করা। যদি আপনার ঠোঁট-জিহ্বার নড়াচড়ার সাথে আসলেই কোনো ফিসফিসানির মতো মৃদু শব্দ উৎপন্ন হয় এবং আপনার কানে তা ধরা পড়ে, তবে তা শাব্দিক উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হবে।
তালাকের মতো গুরুতর বিষয়ে সন্দেহ এড়াতে সর্বদা স্পষ্ট ও শ্রুতিগোচর শব্দে উচ্চারণ করা উচিত।
রেফারেন্স:
হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে, যে কোনো কথা (কালাম) কার্যকর হওয়ার জন্য তা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক, যা নিজে শোনা যায়।
- আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক: এখানে তালাকের শাব্দিক উচ্চারণের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
- রাদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার (ফাতওয়ায়ে শামী), কিতাবুত তালাক: ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, কথা কার্যকর হতে হলে তা এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যাতে ব্যক্তি নিজেই শুনতে পায়, যদি আশেপাশে কোনো প্রতিবন্ধকতা (যেমন কোলাহল) না থাকে।
* "ولو حرك لسانه بالطلاق ولم يسمعه لا يقع، وإن سمعه يقع، والشرط أن يسمع نفسه إن لم يكن هناك مانع كصمم أو لغط" (অর্থাৎ, যদি তালাকের শব্দে জিহ্বা নড়াচড়া করে কিন্তু নিজে না শোনে, তালাক হবে না; আর যদি শোনে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। শর্ত হলো, যদি সেখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা যেমন বধিরতা বা কোলাহল না থাকে, তাহলে নিজেকে শোনাতে হবে)।
মুফতি ওয়ালীউল্লাহ সাহেবের বক্তব্য এই মূলনীতি অনুসারেই দেওয়া হয়েছে।