মুফতি ওয়ালীউল্লাহ এক ফতোয়ার উত্তরে বলেছে মনে মনে ঠোট জিহবা নাড়িয়ে তালাক এর শব্দ শুনলে এত টুকু আওয়াজ হওয়া চাই যখন ফ্যান বা অন্য আওয়াজ না থাকলে কানে আসতো। এখন আমি তো অনেক একবারে লাস্ট টাইপের আওয়াজ করলেও কানে শুনতে পাই। তাইলে কানে আসবে না ওই আওয়াজ কোনটা। ভাই তুমি কথা বুঝো নাই আমি বলছি আমি একবারে লাস্ট যে আওয়াজ শুনি সেটা ফ্যান থাকলেও শুনি। আমার ক্ষেত্রে বলি আমি জানতাম মনে মনে তালাক হয় না। তাই বাথরুম এ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তালাকের সরীহ কথা জিহবা ঠোট নেড়ে এমন ভাবে বলি যাতে এক ফোটা আওয়াজ না বাইর হয় কিন্তু আমি আয়নায় আমার ঠোট নড়তে দেখছি, বাস্তবে কথা বললে যেমন হইতো তেমন বলছি কিন্তু এক ফোটা আওয়াজ কানে যায় নাই যাবে কিভাবে আমি টো জানতাম ফতোয়া টা, আবার পরিবেশ নীরব ছিলো। কিন্তু মতিউর রহমান মাদানির ফোতূয়া দেইখা মাথা খারাপ হইছে তার মনে ঠোট আর জিহবা নড়লেই হইলো। আমি তো জানি মনে মনে কথা মানেই নিজ কাছে কোন আওয়াজ না শুনা যতই মুখ নেড়ে যত জোরে বলি। কিন্তু জিহিবার পট বা টুট এক দুইটা শব্দ যদি বেতিয়ে যায় তাইলেও হবে না? আমি শিউর আমার বের হয় নাই বাট আমি অন্য শব্দ দিয়ে আওয়াজ টেস্ট করার সময় পট সব্দ হচ্ছে ১ ফোটা তাই তখন ছিলো লিনা এটা নিয়া সন্দেহ হয়
আপনার প্রশ্ন এবং দুশ্চিন্তা বুঝতে পারছি। তালাকের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে মনে দ্বিধা থাকা স্বাভাবিক। চলুন, আপনার প্রতিটি পয়েন্টের উপর ভিত্তি করে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার শর্ত:
হানাফি মাযহাবে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:
1.
তালাক দেওয়ার ইচ্ছা (নিয়্যত): তালাকের শব্দ উচ্চারণ করার সময় তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে।
2.
স্বামী কর্তৃক উচ্চারণ: স্বামী নিজেই তালাকের শব্দ উচ্চারণ করবে।
3.
শ্রবণযোগ্যতা (তালাকের শব্দ নিজে শুনতে পাওয়া): তালাকের শব্দ এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যেন স্বামী নিজে তা শুনতে পান, যদি আশেপাশে কোনো কোলাহল না থাকে।
মুফতি ওয়ালীউল্লাহর ফতোয়া এবং হানাফি অবস্থান:
মুফতি ওয়ালীউল্লাহর ফতোয়ার যে অংশটি আপনি উল্লেখ করেছেন: "মনে মনে ঠোট জিহবা নাড়িয়ে তালাক এর শব্দ শুনলে এত টুকু আওয়াজ হওয়া চাই যখন ফ্যান বা অন্য আওয়াজ না থাকলে কানে আসতো।" – এটি হানাফি মাযহাবের স্বীকৃত মতের সাথে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ।
এর ব্যাখ্যা হলো:
- শুধু মনে মনে চিন্তা করা (without moving lips/tongue): শুধু মনে মনে তালাকের কথা ভাবলে তালাক হয় না, এমনকি যদি মনে মনে তালাকের শব্দের প্রতিটি অক্ষর কল্পনা করা হয়।
- ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানো কিন্তু কোনো আওয়াজ না হওয়া: ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়িয়ে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা হলো, কিন্তু এতটুকুও শব্দ বের হলো না যে, নীরব পরিবেশে নিজেও তা শুনতে পান – এমন অবস্থায় হানাফি মাযহাবে তালাক কার্যকর হয় না।
- আওয়াজ নিজে শুনতে পাওয়া: তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য সর্বনিম্ন যেটুকু আওয়াজ হওয়া জরুরি, তা হলো স্বামী নিজে তার বলা শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছেন। যদি ফ্যান বা অন্য কোনো শব্দের কারণে শোনা না যায়, তাহলে দেখতে হবে, যদি নীরব পরিবেশ থাকত, তাহলে কি তিনি নিজের শব্দ শুনতে পেতেন? যদি উত্তর 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে তালাক কার্যকর হবে। আর যদি নীরব পরিবেশেও তিনি নিজের শব্দ শুনতে না পান (অর্থাৎ কেবল ঠোঁট আর জিহ্বা নড়েছে, কিন্তু কোনো আওয়াজই বের হয়নি), তাহলে তালাক কার্যকর হবে না।
আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা:
আপনার অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:
1. "আমি আয়নায় আমার ঠোট নড়তে দেখছি, বাস্তবে কথা বললে যেমন হইতো তেমন বলছি কিন্তু এক ফোটা আওয়াজ কানে যায় নাই যাবে কিভাবে আমি টো জানতাম ফতোয়া টা, আবার পরিবেশ নীরব ছিলো।"
* এই অংশে আপনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, আপনি ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়িয়েছেন কিন্তু এক ফোঁটা আওয়াজও আপনার কানে যায়নি, যদিও পরিবেশ নীরব ছিল। আপনি নিজেও জানতেন যে আওয়াজ না হলে তালাক হয় না, তাই আপনি আওয়াজ বের না করার উদ্দেশ্য নিয়েই এমনটা করেছেন।
* হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, এই অবস্থায় তালাক কার্যকর হয়নি। কারণ, আপনি নিজে আপনার উচ্চারিত শব্দ (যদি তা শব্দ বলা যায়) শুনতে পাননি, যা তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য আবশ্যকীয় শর্ত।
2. "মতিউর রহমান মাদানির ফোতূয়া দেইখা মাথা খারাপ হইছে তার মনে ঠোট আর জিহবা নড়লেই হইলো।"
* বিভিন্ন মাযহাব ও মতের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কিছু কিছু মাসআলায় মতপার্থক্য থাকতে পারে। ড. মতিউর রহমান মাদানী (হাফিযাহুল্লাহ) হয়তো অন্য কোনো মাযহাবের মত বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তার ফতোয়া দিয়েছেন।
* কিন্তু আপনি যেহেতু আপনার প্রশ্ন "ifatwa.info অনুযায়ী হানাফি সংক্ষিপ্ত উত্তর" জানতে চেয়েছেন এবং আপনি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তাই আপনার জন্য হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত অনুসরণ করাই যথেষ্ট। হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত হলো, শুধু ঠোঁট ও জিহ্বা নড়াচড়ায় তালাক হয় না, বরং নিজে শুনতে পাওয়ার মতো আওয়াজ হওয়া আবশ্যক।
3. "জিহিবার পট বা টুট এক দুইটা শব্দ যদি বেতিয়ে যায় তাইলেও হবে না? আমি শিউর আমার বের হয় নাই বাট আমি অন্য শব্দ দিয়ে আওয়াজ টেস্ট করার সময় পট সব্দ হচ্ছে ১ ফোটা তাই তখন ছিলো লিনা এটা নিয়া সন্দেহ হয়।"
* যদি তালাক উচ্চারণের সময় বাস্তবিকভাবেই আপনার মুখ থেকে এমন কোনো "পট" শব্দ বা এতটাই ক্ষীণ শব্দ বের হতো যা আপনি নিজে শুনতে পেতেন (যদিও খুবই কম), তাহলে তালাক কার্যকর হয়ে যেত।
* কিন্তু আপনি নিজেই বলেছেন, "আমি শিউর আমার বের হয় নাই"। আপনি এখন সন্দেহ করছেন যে পরে অন্য শব্দ টেস্ট করার সময় "পট" শব্দ হচ্ছে, তা দিয়ে আপনার সেই সময়ের তালাকের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
* ইসলামী শরীয়তে, কোনো বিষয়ের নিশ্চিত অবস্থা (যেমন, আপনার বিবাহবন্ধনে থাকা) সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে প্রমাণ না হয় যে, তালাকের শর্ত অনুযায়ী আপনি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, ততক্ষণ বিবাহ অটুট থাকবে। আপনার ক্ষেত্রে, আপনি নিজেই নিশ্চিত যে কোনো আওয়াজ বের হয়নি। পরে অন্য আওয়াজ টেস্ট করতে গিয়ে যে "পট" শব্দ শুনছেন, সেটি সেই সময়ের তালাক উচ্চারণের সাথে সম্পর্কিত নয়। সুতরাং, এই সন্দেহের কারণে আপনার বিবাহ ভঙ্গ হয়নি।
সারসংক্ষেপ এবং চূড়ান্ত ফতোয়া:
মুফতি ওয়ালীউল্লাহর ফতোয়া এবং হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে (যখন আপনি তালাকের শব্দ জিহ্বা ও ঠোঁট নেড়ে উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু নিজে কোনো আওয়াজ শুনতে পাননি, এমনকি নীরব পরিবেশেও) আপনার তালাক কার্যকর হয়নি। আপনার বিবাহবন্ধন অক্ষত আছে।
তালাকের বিষয়ে সন্দেহ দূর করার জন্য এই ফতোয়াই যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সহজতা দান করুন।
রেফারেন্স:
- আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি), কিতাবুত তালাক।
- বাদা'ইউস সানায়ে', কিতাবুত তালাক।
- রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার (ইবনে আবিদীন)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মনে রাখবেন, তালাকের বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকলেও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতির সাথে সরাসরি কথা বলা সবচেয়ে উত্তম। তবে উপরে বর্ণিত ফতোয়াটি হানাফি মাযহাবের স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে।