🏠 Home

iFatwa Q&A (Hanafi Fiqh)

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, সম্মানিত উস্তাদ আশা করি আপনি ভালো আছেন এবং ঈমানের সাথে সুস্থ আছেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আপনাকে বরকত দিন, আপনার ইলম বৃদ্ধি করুন এবং আমাদেরকে আপনার জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমি আপনাকে লিখছি যে বিষয়ে, সে টা নিয়ে আমি অনেক বিভ্রান্তি ও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি আমার দ্বীনি দায়িত্ব সম্পর্কে। আমি বিভিন্ন আলেমদের কাছ থেকে বিড়াল পোষা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত শুনেছি। কেউ বলেন ইসলামে বিড়াল পোষা জায়েজ, আবার কেউ বলেন ঘরের ভিতরে বিড়াল পোষা অনুমোদিত নয়। এমনকি আমার দেশের একজন সম্মানিত আলেম বলেছেন যে, ঘরে বিড়াল রাখা জায়েজ নয় এবং তাদের খাবার ও যত্নের পেছনে খরচ করাও অনুমোদিত নাও হতে পারে। এই বিষয়গুলো আমাকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে, কারণ আমি চাই আমার কাজগুলো শরীয়াহ অনুযায়ী হোক। বর্তমানে আমার ঘরে তিনটি পার্সিয়ান বিড়াল রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশে পার্সিয়ান বিড়াল সহজলভ্য নয়, তাই আমাকে সেগুলো কিনতে হয়েছে। এছাড়াও, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, প্রচণ্ড শীতের সময় একটি পথের বিড়াল আমার দরজায় আসে। আমি দয়া করে তাকে খাবার দেই। পরে সে চলে যায়, কিন্তু পরের দিন আবার ফিরে আসে এবং নিজ থেকেই থাকতে শুরু করে। এরপর থেকে আমি তাকে ঘরেই রেখে যত্ন নিচ্ছি। কিন্তু বিভিন্ন মতামত শোনার কারণে এখন আমি দুশ্চিন্তায় আছি: • আমি কি তাদের ঘরে রেখে গুনাহ করছি? • ইসলাম অনুযায়ী ঘরের ভিতরে বিড়াল পোষা কি জায়েজ? • পার্সিয়ান বা অন্যান্য বিদেশি জাতের বিড়াল কেনা-বেচা কি জায়েজ? • তাদের খাবার, যত্ন ও লিটার (বাথরুম) এর জন্য যে খরচ করছি, তা কি অপচয় বা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে? • আখিরাতে কি আমাকে এসবের জন্য জবাবদিহি করতে হবে? আমার নিয়ত সবসময়ই ছিল তাদের প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীলতার সাথে যত্ন নেওয়া, কোনো অপচয় বা ভুল কাজের উদ্দেশ্যে নয়। তবুও আমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা)-এর অসন্তুষ্টির ভয়ে আছি এবং যদি আমার কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমি তা সংশোধন করতে চাই। এবং যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে কি করবো আমি এই অবলা প্রানীদের নিয়ে? আমি অনেক মুফতিদের দেখছি (ইউটিউব এ) যাদের বাসায় বিড়াল আছে এবং বিড়াল থাকলে তাদের মিনিমাম যত্ন তো মাসে ১/২ বার হলেও নিতে হয়। আমি আমার যাকাত আদায় করি, সাধ্যমত সাদাকা করি, যেগুলো আমার উপর ফর‍জ/ ওয়াজিব সব দায়িত্ব আলহামদুলিল্লাহ আমি পালন করি। আমি আপনার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকব যদি আপনি দয়া করে আমাকে এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে দিতেন, যাতে আমি ইসলামের সঠিক পথে চলতে পারি। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু,

সম্মানিত ভাই/বোন,

আপনার দুশ্চিন্তা এবং দ্বীনি দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ অনুধাবন করতে পারছি। আল্লাহ তায়ালা আপনার ইলম বৃদ্ধি করুন এবং আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে নিচে দেওয়া হলো:

ইসলামে বিড়াল পোষা এবং তাদের যত্ন নেওয়া সম্পর্কে আপনার উদ্বেগ অমূলক নয়, তবে প্রচলিত ভুল ধারণার কারণে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ইসলামে বিড়াল পোষা মূলত জায়েজ এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

আপনার প্রশ্নগুলো একে একে উত্তর দেওয়া হলো:

১. আমি কি তাদের ঘরে রেখে গুনাহ করছি? ইসলাম অনুযায়ী ঘরের ভিতরে বিড়াল পোষা কি জায়েজ?
না, আপনি বিড়াল ঘরে রেখে কোনো গুনাহ করছেন না। বরং, ইসলামে বিড়ালকে একটি পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ঘরে বিড়াল পোষা জায়েজ। তাদের লালা বা লোম অপবিত্র নয়।

প্রমাণ:
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"বিড়াল অপবিত্র নয়। এরা তোমাদের আশেপাশে বিচরণকারী প্রাণী।" (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস: ৭৬, সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ৯২, সুনানে নাসায়ী, হাদিস: ৬৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৬৯)।
হানাফি ফিকহে এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে বিড়ালকে তাহির (পবিত্র) ধরা হয় এবং তাদের ঘর, কাপড় বা পাত্রে বিচরণ করা কোনো অপবিত্রতা তৈরি করে না।

২. পার্সিয়ান বা অন্যান্য বিদেশি জাতের বিড়াল কেনা-বেচা কি জায়েজ?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিড়াল কেনা-বেচা জায়েজ। যদিও কিছু ফিকহী মাযহাবে এর ব্যাপারে ভিন্ন মত রয়েছে (যেমন হাদিসে বিড়াল বিক্রয়কে নিষেধ করা হয়েছে - মুসলিম: ১৫৬৯), তবে হানাফি ফুকাহাগণ মনে করেন যে, বিড়াল যেহেতু উপকারী প্রাণী এবং এটি একটি মাল (সম্পদ) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে (বিশেষ করে এর বিভিন্ন উপযোগিতার কারণে, যেমন কীটপতঙ্গ নিধন, বা সৌন্দর্য ও সঙ্গী হিসেবে), তাই এর ক্রয়-বিক্রয় বৈধ। বিশেষ করে পার্সিয়ান বা অন্যান্য বিদেশি জাতের বিড়াল, যেগুলোর একটি অর্থনৈতিক মূল্য ও চাহিদা রয়েছে, সেগুলোর ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ।

প্রমাণ:
বিখ্যাত হানাফি ফিকহের গ্রন্থ আল-হিদায়াহ-তে উল্লেখ আছে: "بيع الهرة جائز" (বিড়াল বিক্রয় জায়েজ)। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এটি একটি মাল (সম্পদ) যার দ্বারা উপকার লাভ করা যায়।
(আল-হিদায়াহ, কিতাবুল বুয়ূ')

৩. তাদের খাবার, যত্ন ও লিটার (বাথরুম) এর জন্য যে খরচ করছি, তা কি অপচয় বা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে?
না, বিড়ালের খাবার, যত্ন ও লিটার বাবদ খরচ করা কোনো অপচয় বা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি সওয়াবের কাজ। প্রাণী পোষার পর তাদের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও সদয় আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা।

প্রমাণ:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি একটি বিড়ালকে বেঁধে রাখল, তাকে না খাবার দিল, না পানি দিল, না তাকে ছেড়ে দিল যাতে সে মাটি থেকে কিছু খেতে পারে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করালেন।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৩০৭, সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৪২)।
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করা আবশ্যক। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে খরচ করা ইবাদত এবং এর জন্য প্রতিদান রয়েছে। আপনার নিয়ত যেহেতু দয়া ও দায়িত্বশীলতার সাথে যত্ন নেওয়া, তাই আপনার এই খরচ অপচয় নয় বরং সাদাকার অন্তর্ভুক্ত।

৪. আখিরাতে কি আমাকে এসবের জন্য জবাবদিহি করতে হবে?
হ্যাঁ, আপনাকে আখিরাতে এই প্রাণীদের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, তবে ইতিবাচকভাবে। আপনি তাদের প্রতি যে দয়া, যত্ন ও দায়িত্বশীলতা দেখিয়েছেন, সেগুলোর জন্য আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন। যদি আপনি তাদের অবহেলা করতেন বা কষ্ট দিতেন, তবে তার জন্য জবাবদিহিতা ভিন্ন হতো। আপনার বর্তমান আচরণ শরীয়াহ সম্মত এবং এর জন্য আপনি সওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ।

সাধারণ নির্দেশনা ও সারসংক্ষেপ:


আপনার মতো অনেক মুফতি ও আলেমদের ঘরে বিড়াল দেখা যায়, যা এই মাসআলার বৈধতার একটি ইঙ্গিত। আপনার যাকাত, সাদাকা ও অন্যান্য ফরয-ওয়াজিব দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে এই অবলা প্রাণীদের প্রতি আপনার দয়া আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল।

সুতরাং, আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আপনার বিড়ালদের প্রতি আপনার এই দয়া ও যত্ন আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন এবং আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।