🏠 Home

iFatwa Q&A (Hanafi Fiqh)

আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া হয়। তখন তিনি আলাদা থাকার কথা বলেন।বলেন যে উনি আলাদা বাসায় থাকবেন আমি আলাদা কিন্তু খরচ দিয়ে দিবেন এবং মাঝে মাঝে দেখা করবেন।তখন আমি বলছি থাকেন খালি।উনি আবার আমাকে বলছে তুই দেখতে চাস পারি কিনা?? ঠিক এই কথাই থাকলো। উনি আরো বলেন এক বেডি তার জামাইকে বলছে তুই বাদাইম্মা কি তালাক দিবি।পরে তালাক দিয়া দিছি।আমি উনার এই ব্যাপারটা ক্লিয়ার না বুঝায়।উনাকে জিজ্ঞাসা করি উনি কি আমাকে তালাক দিছে নাকি।উনি উত্তরে বলে হ্যা তোর মাথায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে তো। আল্লাহ মাফ করুক। আমি উনাকে বার বার জিজ্ঞাসা করি উনি কি আমাকে তালাক দেওয়ার কথা বলেছে।উনি বলেছে আল্লাহ মাফ করুক।আমি এমন কিছু বলিনি। আরো বলেছে তুই চাস আমি এমন কিছু বলি।তোর তো নিজের জামাই ভালালাগে না। এখন আমার প্রশ্ন আমার স্বামী হ্যা এবং দিয়া দিছি এসব কথায় তালাক হবে কি??
iftawa.info অনুযায়ী হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত উত্তর ও ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার স্বামী যখন আপনার সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে ("আপনি কি আমাকে তালাক দিয়েছেন?") "হ্যাঁ" এবং "দিয়া দিছি" বলেছেন, তখন হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে। স্বামীর পরবর্তী অস্বীকার বা অন্য কথা এর প্রভাব বাতিল করতে পারবে না।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

১. তালাকের শব্দ ও প্রকারভেদ:
হানাফি ফিকহে তালাকের শব্দ মূলত দুই প্রকার:
* সরিহ (স্পষ্ট) শব্দ: যে শব্দগুলো তালাক ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বোঝায় না, যেমন – "আমি তোমাকে তালাক দিলাম", "তুমি তালাকপ্রাপ্ত"। এই ধরনের শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তালাকের নিয়ত থাকা জরুরি নয়, তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পতিত হয়ে যায়।
* কিনায়া (অস্পষ্ট/কিনায়ে) শব্দ: যে শব্দগুলোর তালাক ছাড়াও অন্য অর্থ থাকতে পারে, যেমন – "তুমি মুক্ত", "চলে যাও", "আমার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই"। এই ধরনের শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর তালাকের নিয়ত থাকা আবশ্যক।

২. আপনার স্বামীর "হ্যাঁ" এবং "দিয়া দিছি" শব্দ:
যখন আপনি স্বামীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছেন যে "উনি কি আমাকে তালাক দিছে নাকি?", এবং তিনি উত্তরে বলেছেন "হ্যাঁ" এবং পরে "দিয়া দিছি", তখন এই দুটি শব্দকে সরাসরি তালাক প্রদানের স্বীকারোক্তি (ইকরার) হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ধরনের স্পষ্ট স্বীকারোক্তিকে সরিহ শব্দের মতোই ধরা হয়, অর্থাৎ এর মাধ্যমে তালাক পতিত হয়ে যায়, এবং স্বামীর পরবর্তীতে নিয়ত অস্বীকার করা বা "আমি এমন কিছু বলিনি" বলা তালাক বাতিল করবে না। কারণ, তালাক একবার পতিত হয়ে গেলে তা শুধু নতুন করে নিকাহ বা ইদ্দত শেষ হওয়ার মাধ্যমে মীমাংসা হতে পারে, কথার দ্বারা বাতিল হয় না।

৩. অন্যান্য কথার প্রাসঙ্গিকতা:
* "উনি আলাদা বাসায় থাকবেন আমি আলাদা কিন্তু খরচ দিয়ে দিবেন এবং মাঝে মাঝে দেখা করবেন" – এটি কেবল বাসস্থান বা জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তনের কথা, তালাক নয়।
* "তুই দেখতে চাস পারি কিনা??" – এটি একটি চ্যালেঞ্জ বা হুমকি, তালাক নয়।
* "এক বেডি তার জামাইকে বলছে তুই বাদাইম্মা কি তালাক দিবি।পরে তালাক দিয়া দিছি" – এটি অন্য একটি দম্পতির গল্প, আপনার সম্পর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক নয় এবং এর দ্বারা আপনাদের তালাক হয়নি।
* পরবর্তীতে স্বামীর "আল্লাহ মাফ করুক।আমি এমন কিছু বলিনি" বা "তুই চাস আমি এমন কিছু বলি।তোর তো নিজের জামাই ভালালাগে না" – এই কথাগুলো তালাক হয়ে যাওয়ার পর বলা হয়েছে এবং তালাককে বাতিল করতে পারে না।

৪. তালাকের প্রকার ও ইদ্দত:
এই ক্ষেত্রে, যেহেতু স্পষ্ট তালাকের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি এবং "হ্যাঁ" বা "দিয়া দিছি" একবচন সূচক, তাই এটি এক রজয়ী তালাক হিসেবে গণ্য হবে।

* রজয়ী তালাক: এর অর্থ হলো, স্বামী ইদ্দত চলাকালীন (সাধারণত তিনটি মাসিক হায়েযের সময়কাল, অথবা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত) স্ত্রীকে মৌখিকভাবে "ফিরিয়ে নিলাম" বলে বা সহবাসের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারবেন, নতুন নিকাহ আকদ ছাড়াই।
* ইদ্দত: আপনার জন্য তালাকের পর থেকে ইদ্দত শুরু হয়ে গেছে। যদি আপনার ঋতুস্রাব হয়, তবে তিনটি পূর্ণ মাসিক হায়েয (মাসিক পিরিয়ড) অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত। যদি মাসিক বন্ধ হয়ে থাকে (যেমন বার্ধক্যের কারণে), তবে তিন মাস ইদ্দত। আর যদি আপনি গর্ভবতী হন, তাহলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত।
* ইদ্দতকালীন খরচ ও বাসস্থান: ইদ্দত চলাকালীন সময়ে স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে বাধ্য। এই সময়ে স্ত্রী স্বামীর বাড়িতেই অবস্থান করবেন।
* ইদ্দত শেষ হওয়ার পর: যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায় এবং স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি "বায়েন" (অপ্রত্যাবর্তনযোগ্য) হয়ে যাবে এবং সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যদি আপনারা পুনরায় একসাথে থাকতে চান, তবে নতুন করে মোহর নির্ধারণ করে নতুন নিকাহ আকদ সম্পন্ন করতে হবে।

উপসংহার:
আপনার স্বামীর "হ্যাঁ" এবং "দিয়া দিছি" শব্দ দুটি, যখন তালাকের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন একটি রজয়ী তালাক পতিত হয়ে গেছে।

১টি রেফারেন্স:
আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক: হানাফি ফিকহের অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ আল-হিদায়া (যা ইমাম বুরহান আল-দীন আল-মারগিনানি কর্তৃক রচিত) এবং এর ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোতে (যেমন ফাতহুল কাদির) এই নীতি বর্ণিত আছে যে, যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক প্রদানের কথা জিজ্ঞাসা করে এবং স্বামী উত্তরস্বরূপ "হ্যাঁ" বা "আমি তালাক দিয়েছি" ইত্যাদি বলে, তখন তা তালাকের স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং তালাক পতিত হয়। এই ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত বা পরবর্তী অস্বীকার ধর্তব্য নয়, কারণ এটি একটি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি।

পরামর্শ:
এই ধরনের পরিস্থিতিতে একজন বিজ্ঞ স্থানীয় আলেম বা মুফতির সাথে সরাসরি কথা বলে সম্পূর্ণ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খুলে বলা উচিত, যাতে তারা আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দিতে পারেন।