আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, হুজুর আমার স্ত্রিকে অনেক বুজানোর পরেও সে নামাজ না পরলে, আমি একজন আলেমের কাছে সব খুলে বলি যে, আমি তাকে কতভাবে বুজাচ্চি নামাজের পরার কথা। আলেম সাহেবকে বলি আমি নামাজের কথা স্ত্রিকে বললে বা ইসলামের কোন বিধান পাপ সম্নধে তাকে বুজাতে গেলে সে রাগ করে বুজতে চায়না। এমতবস্তায় আমি আলেম সাহেবের কাছে বলি আমার কি করা উচিত,আমি আলেম সাহেবকে বলি যে আজকে স্ত্রিকে আমি বলেছি যে আমি তোমার হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে পারি সর্বচ্চ আর কি করতে পারি। আলেম সাহেব আমার সব কিছু শোনে তিনি আমাকে বলেন "এভাবে সংসার টিকানো সম্ভব না " আপনি স্ত্রির বাবা মাকে জানান আমি তখন বলি আমার শাশুরিও ঠিকমত নামাজ পরে না তাকে আর কি বলব, তখন আলেম সাহেব আমাকে পরামর্শ দেন স্ত্রিকে জানাতে যে " এভাবে সংসার টিকানো সম্ভব না " আমি আলেম সাহেবের কথা শুনে শুধু বলি ঠিক আছে হুজুর, মানে আমার নিয়ত ছিল স্ত্রিকে জানাবো যে এই এত করে তোমাকে নামাজের কথা বলার পরেও তুমি নামাজ পরো না, এভাবে তুমি নামাজ না পরলে সংসার টিকানো সম্ভব না এই উদ্দেশ্য বা নিয়তে আমি আলেম সাহেবের পরামর্শ যে স্ত্রিকে জানান যে এভাবে সংসার টিকানো সম্ভব না তখন শুধু ঠিক আছে বলেছি আলেম
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
সম্মানিত ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি সংবেদনশীল পারিবারিক ও দ্বীনি বিষয় নিয়ে। স্ত্রীর নামাজ না পড়া এবং এ বিষয়ে আলেমের পরামর্শের প্রেক্ষিতে আপনার করণীয় সম্পর্কে ফাতওয়া.ইনফো অনুযায়ী হানাফি ফিকহের আলোকে সংক্ষিপ্ত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. নামাজ ত্যাগের বিধান:
নামাজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এবং প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ (মহা পাপ)। তবে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, যে ব্যক্তি নামাজের ফরজিয়্যতকে অস্বীকার করে না, কিন্তু অলসতা বা গাফিলতির কারণে নামাজ পড়ে না, সে কাফের হয়ে যায় না, বরং ফাসেক (গুনাহগার) হিসাবে গণ্য হবে। এই ব্যক্তি তওবা না করলে আখেরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
২. স্বামীর দায়িত্ব:
স্বামী তার পরিবারের অভিভাবক। তাই স্ত্রীর নামাজ পড়া, দ্বীনের অন্যান্য বিধি-বিধান পালন করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে স্বামীকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে, উপদেশ দিতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে সতর্ক করতে হবে। স্ত্রীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করাও স্বামীর দায়িত্ব।
৩. আলেমের পরামর্শের ব্যাখ্যা এবং আপনার নিয়ত:
- "এভাবে সংসার টিকানো সম্ভব না" - এই বাক্যটি তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ (صريح) নয়, বরং এটি ইঙ্গিতপূর্ণ (كناية) শব্দ। এই ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত থাকা জরুরি।
- আলেম সাহেবের উদ্দেশ্য: আলেম সাহেব সম্ভবত আপনার স্ত্রীর অবস্থার ভয়াবহতা বোঝাতে এবং আপনাকে এই বার্তাটি আপনার স্ত্রীকে জানাতে বলেছেন, যাতে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেন এবং নামাজ শুরু করেন। এর উদ্দেশ্য সরাসরি তালাক দেওয়া নয়, বরং স্ত্রীকে সতর্ক করা।
- আপনার নিয়ত: আপনি বলেছেন আপনার নিয়ত ছিল স্ত্রীকে জানানো যে, "এত করে তোমাকে নামাজের কথা বলার পরেও তুমি নামাজ পরো না, এভাবে তুমি নামাজ না পরলে সংসার টিকানো সম্ভব না।" অর্থাৎ আপনার উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রীকে তার নামাজ না পড়ার ভয়াবহ পরিণতি এবং এর ফলে দাম্পত্য জীবনে যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে তা বোঝানো, তালাক দেওয়া নয়।
ফাতওয়া:
আপনার আলেমের পরামর্শের প্রতি আপনার "ঠিক আছে হুজুর" বলা এবং সেই পরামর্শ স্ত্রীকে জানানোর সময় আপনার নিয়ত যদি শুধু স্ত্রীকে সতর্ক করা এবং তার উপর নামাজ আদায়ের গুরুত্ব বোঝানো হয়ে থাকে, তালাক দেওয়ার নিয়ত না থাকে, তাহলে উপরোক্ত বাক্য দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বহাল আছে।
আপনার করণীয়:
1. নরমভাবে বোঝানো: স্ত্রীকে ধৈর্য ধরে নরমভাবে, সুন্দর ভাষায় নামাজের গুরুত্ব, এর ফজিলত এবং না পড়ার শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিন। সরাসরি রাগারাগি বা ঝগড়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে ফলাফল উল্টো হতে পারে।
2. পরিবেশ তৈরি করা: ঘরে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন। নামাজি ব্যক্তিদের সঙ্গ দেওয়া, ইসলামি আলোচনা শোনা বা দেখা, ইসলামিক বই পড়া ইত্যাদি কাজে উৎসাহিত করুন।
3. দোয়া করা: স্ত্রীর হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে থাকুন। হেদায়েতের মালিক আল্লাহ তা'আলা।
4. সতর্ক করা (আপনার নিয়ত অনুযায়ী): আপনি স্ত্রীকে আপনার নিয়ত অনুযায়ী বলতে পারেন যে, "তুমি যদি নামাজ না পড়ো, তাহলে এই জীবন আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে এবং এভাবে সংসার টিকিয়ে রাখা আমার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।" এটি আপনি তাকে বোঝানোর জন্য এবং তাকে শোধরানোর জন্য বলছেন, তালাকের নিয়তে নয়। এটি তাকে অনুধাবন করাতে সাহায্য করতে পারে যে, তার এই আচরণ আপনার জন্য কতটা কষ্টের এবং দাম্পত্য জীবনের জন্য কতটা ক্ষতিকর।
5. ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত: যদি দীর্ঘ চেষ্টার পরেও কোনো উন্নতি না হয়, তবে এই ধরনের একটি বিয়েতে থাকা আপনার জন্য কঠিন হলেও, শরিয়ত অনুযায়ী এটি বিয়ে ভাঙার জন্য সরাসরি কোনো কারণ নয় (যদি সে নামাজের ফরজিয়্যত অস্বীকার না করে)। তবে, এমন জীবনসঙ্গিনীর সাথে জীবনযাপন কঠিন হয়। এক্ষেত্রে আপনি পুনরায় কোনো বিজ্ঞ আলেমের সাথে পরামর্শ করে ভবিষ্যৎ পথ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা চাইতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম হালাল কাজ।
এক রেফারেন্স সহ:
- আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'রাদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার' (ফাতাওয়া শামী) এ তালাকের মাসায়েল আলোচনা প্রসঙ্গে 'কিনায়েতে তালাক' এর ব্যাপারে বলেন: "কিনায়েতের শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত থাকা শর্ত। যদি তালাকের নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।" (উল্লেখ্য, আপনার উল্লেখিত বাক্যটি 'কিনায়েতে তালাক' এর অন্তর্ভুক্ত)।
*
"كنايات الطلاق ما يحتمل الطلاق وغيره، فلا يقع بها الطلاق إلا بالنية أو دلالة الحال" (رد المحتار على الدر المختار، كتاب الطلاق، باب الكنايات)
* অর্থাৎ, তালাকের কিনায়েত (ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ) সেগুলো যা তালাক এবং অন্য অর্থ উভয়কেই বোঝায়। এগুলো দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না তালাকের নিয়ত থাকে বা পরিস্থিতি এমন হয় যা তালাকের ইঙ্গিত দেয়। আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই তালাক হয়নি।
আল্লাহ তা'আলা আপনার স্ত্রীকে হেদায়েত দান করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। আমিন।
والله تعالى أعلم بالصواب