সুরা গাফির আয়াত ১৯ এই আয়াত দ্বারা কি কি তদবীর বা রুকিয়া করা যাবে? এই আমল কিভাবে আমেল হবো?আমলে পদ্ধতি শিখিয়ে দাও।এই আয়াতের মোয়াক্কেল হাসিল কিভাবে করব?
সূরা গাফির-এর ১৯ নম্বর আয়াতটি হল:
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
(ইয়া'লামু খা'ইনাতাল আ'য়ুনি ওয়ামা তুখফিস সুদূর)
অর্থ: "তিনি (আল্লাহ) জানেন চোখের খিয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে।"
এই আয়াতটি আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও ক্ষমতার এক চমৎকার বর্ণনা। আল্লাহ তায়ালা কেবল প্রকাশ্য বিষয়গুলোই জানেন না, বরং চোখের ক্ষুদ্রতম ইঙ্গিত, যা একজন মানুষ অন্যকে না জানিয়ে করে, এবং অন্তরের গভীরতম গোপন বিষয়াদিও তিনি জানেন।
ইফাতওয়া.ইনফো (ifatwa.info) সহ মূলধারার আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের (হানাফী মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত) দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে এই আয়াতের তদবীর বা রুকিয়া এবং আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
---
সুরা গাফির, আয়াত ১৯ দ্বারা কি কি তদবীর বা রুকিয়া করা যাবে?
এই আয়াতটি সরাসরি নিরাময় বা নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্দেশিত নয়। তবে আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও গোপন বিষয় জানার ক্ষমতার উপর জোর দেওয়ার কারণে, এটি কিছু নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে:
1.
বদ নজর (Evil Eye) থেকে সুরক্ষা: আয়াতের প্রথম অংশ "يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ" (তিনি চোখের খিয়ানত জানেন) এই বিষয়টি নির্দেশ করে। যদিও এর মূল অর্থ চোখের সূক্ষ্ম অন্যায়, তবে এর দ্বারা চোখের মাধ্যমে আসা যেকোনো ক্ষতি (যেমন বদ নজর বা কুদৃষ্টি) থেকে সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়া যেতে পারে। কারণ আল্লাহ তায়ালা জানেন কোন্ চোখ দিয়ে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
*
ব্যবহার পদ্ধতি: বদ নজরের শিকার ব্যক্তিকে অথবা সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে বারবার এই আয়াতটি পড়ে ফুঁ দেওয়া যেতে পারে। পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি পান করা বা গোসল করা যেতে পারে।
2.
গোপন শত্রু বা ক্ষতি থেকে সুরক্ষা: আয়াতের দ্বিতীয় অংশ "وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ" (এবং অন্তর যা গোপন রাখে) নির্দেশ করে যে আল্লাহ অন্তরের সমস্ত গোপন বিষয় জানেন। এর মাধ্যমে মানুষ বা জিনদের অন্তরে লুকায়িত শত্রুতা, চক্রান্ত, হিংসা বা যেকোনো গোপন ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা চাওয়া যেতে পারে।
*
ব্যবহার পদ্ধতি: কোনো ব্যক্তি যদি আশঙ্কা করেন যে কেউ তার ক্ষতি করার জন্য গোপন চক্রান্ত করছে বা তার প্রতি হিংসা পোষণ করছে, তবে তিনি এই আয়াতটি নিয়মিত পাঠ করে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা চাইতে পারেন।
3.
সত্য উদ্ঘাটন ও সঠিক পথনির্দেশনা: যেহেতু আল্লাহ সব গোপন বিষয় জানেন, তাই কোনো বিষয়ে যদি সত্য উদ্ঘাটনের প্রয়োজন হয়, বা কোনো রহস্য উন্মোচন করতে হয়, তবে এই আয়াতটি পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেতে পারে যেন তিনি সত্যকে প্রকাশ করে দেন অথবা সঠিক পথ দেখান।
*
ব্যবহার পদ্ধতি: যখন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা হয় বা সত্য জানা জরুরি হয়, তখন এই আয়াতটি পাঠ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: যেকোনো রুকিয়া বা তদবীরের মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আয়াতটি কেবল একটি মাধ্যম। নিরাময় বা সুরক্ষা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
---
এই আমল কিভাবে আমেল হবো? আমলে পদ্ধতি শিখিয়ে দাও।
"আমেল হওয়া" বলতে বোঝায় কোনো আয়াত বা দুআর নিয়মিত ও আন্তরিক অনুশীলনকারী হওয়া, যার মাধ্যমে সে আয়াতের বরকত ও প্রভাব অনুভব করা যায় এবং অন্যের উপকারের জন্যও ব্যবহার করা যায়। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক পদবি নয়, বরং আধ্যাত্মিক একটি অবস্থা।
আমল হওয়ার পদ্ধতি:
1.
বিশুদ্ধ নিয়ত (উদ্দেশ্য): সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর কালামের বরকত হাসিল করার বিশুদ্ধ নিয়ত করা। কোনো জাগতিক স্বার্থ (যেমন, ক্ষমতা অর্জন বা মানুষকে প্রভাবিত করা) যেন না থাকে।
2.
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (পবিত্রতা): সর্বদা অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা, বিশেষ করে আমল করার সময় অবশ্যই অজু থাকা।
3.
ইতকান ও ইখলাস (বিশ্বাস ও আন্তরিকতা): এই আয়াতের অর্থের উপর গভীর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আমল করা। বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আপনার দোয়া কবুল করবেন।
4.
নিয়মিত তেলাওয়াত:
* প্রতিদিন অন্তত কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক বার (যেমন, ৭, ২১, ৪১, অথবা ১০১ বার) এই আয়াতটি পাঠ করা।
* পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের পর একবার বা তিনবার এই আয়াতটি পাঠ করা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
* রাতে ঘুমানোর আগে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে পাঠ করা।
5.
সালাওয়াত (দুরুদ শরীফ): আমল শুরু করার আগে ও পরে নির্দিষ্ট সংখ্যক বার (যেমন, ৩ বা ৭ বার) দুরুদ শরীফ পাঠ করা। এটি আমলের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
6.
তাফাক্কুর (চিন্তা-ভাবনা): আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে গভীর চিন্তা করা এবং আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও ক্ষমতার কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি বিনয়ী হওয়া।
7.
দুআ: আমল শেষে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে এই আয়াতের বরকতে আপনার নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা। যেমন, বদ নজর থেকে সুরক্ষা, গোপন শত্রুর ক্ষতি থেকে মুক্তি, ইত্যাদি।
8.
সতর্কতা ও পরহেযগারী: সকল পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, হালাল উপার্জন করা এবং ফরজ ইবাদতগুলো নিয়মিত আদায় করা। এটি আমলের নূর ও বরকতকে বৃদ্ধি করে।
কিছু ব্যবহারিক পদ্ধতি:
- পানি বা তেলে ফুঁ দেওয়া: কোনো অসুস্থ ব্যক্তি বা বদ নজরের শিকার ব্যক্তির জন্য, এই আয়াতটি নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়ে পরিষ্কার পানি বা জয়তুনের তেলে ফুঁ দিয়ে সেই পানি পান করানো বা তেল মালিশ করানো যেতে পারে।
- নিজেকে সুরক্ষিত রাখা: প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায়, বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরুর আগে কয়েকবার এই আয়াতটি পড়ে নিজের দুই হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে নিতে পারেন।
এইভাবে নিয়মিত এবং নিষ্ঠার সাথে আমল করলে, ইনশাআল্লাহ, আপনি এই আয়াতের আধ্যাত্মিক উপকারিতা লাভ করতে পারবেন।
---
এই আয়াতের মোয়াক্কেল হাসিল কিভাবে করব?
মূলধারার ইসলামিক (হানাফী) দৃষ্টিকোণ থেকে, কোরআনের আয়াতের "মোয়াক্কেল হাসিল করা" বা "আয়াতের মোয়াক্কেলকে নিয়ন্ত্রণ করা" সম্পূর্ণরূপে শরীয়ত-বিরোধী এবং শিরকের দিকে ধাবিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এই ধরনের ধারণা এবং অনুশীলন থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকা উচিত।
"মোয়াক্কেল" বলতে সাধারণত ঐশী সত্তা, ফেরেশতা বা জিন্নকে বোঝানো হয়, যা নির্দিষ্ট আয়াত বা আল্লাহর নামের সাথে যুক্ত থাকে এবং যাকে কিছু নির্দিষ্ট আমলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে কিছু লোক বিশ্বাস করে।
কেন এটি শরীয়ত-বিরোধী:
1. ফেরেশতাদের নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব: ফেরেশতারা আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁরা কেবল আল্লাহর আদেশ পালন করেন। কোনো মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়াও জায়েজ নয়, বরং সরাসরি আল্লাহর কাছে চাওয়া উচিত।
2. জিন্নদের সাথে সম্পর্ক বিপজ্জনক: জিন্নদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাদের থেকে সাহায্য চাওয়া বা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। অনেক সময় এর মাধ্যমে কাফের জিন্নদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যারা মানুষকে শিরক, কুফর এবং অন্যান্য পাপ কাজে লিপ্ত করে। এতে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
3. শিরকের আশঙ্কা: মোয়াক্কেলদের নিয়ন্ত্রণ করে কোনো কাজ হাসিল করার চেষ্টা করা মানে আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কোনো সত্তার ক্ষমতার উপর ভরসা করা, যা প্রকারান্তরে শিরকের নামান্তর। মুসলমানের একমাত্র ভরসাস্থল হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।
4. সুন্নাহর পরিপন্থী: রাসুলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) কেউই কোরআনের আয়াতের মোয়াক্কেল হাসিল করার বা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো পদ্ধতি শেখাননি। বরং তারা সরাসরি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন এবং কোরআনকে নিরাময় ও রহমত হিসেবে ব্যবহার করতেন আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে।
5. বিদ'আত ও কুসংস্কার: এই ধরনের চর্চা মূলত বিদ'আত এবং কুসংস্কারের অংশ, যা পরবর্তীতে ইসলামে প্রবেশ করেছে।
সঠিক ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি:
কোরআনের আয়াতের বরকত আসে স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে, আয়াতের অন্তর্নিহিত শক্তি থেকে নয় এবং কোনো মোয়াক্কেল নামক সত্তার মাধ্যমেও নয়। আপনি যখন কোরআন পাঠ করেন, তখন আপনি সরাসরি আল্লাহর কালামের বরকত এবং রহমত লাভ করেন। আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস (তাওয়াক্কুল) রেখে, তাঁর কাছে দোয়া করে এবং কোরআনের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করার মাধ্যমেই প্রকৃত উপকার ও সাফল্য লাভ করা যায়।
সুতরাং, সুরা গাফির-এর ১৯ আয়াত বা অন্য কোনো আয়াতের মোয়াক্কেল হাসিল করার চেষ্টা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। এটি আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে এবং ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে। সর্বদা সরাসরি আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
---
এক নজরে ১ রেফারেন্স:
যেহেতু Ifatwa.info নির্দিষ্ট কোনো ফাতওয়া নম্বরের কথা উল্লেখ করেনি, তাই এর সাধারণ হানাফী ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতি অনুসারে এই উত্তর দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের প্রশ্নে সরাসরি কোনো ফাতওয়া নম্বর দেওয়া কঠিন, কারণ "মোয়াক্কেল হাসিল" করার বিষয়টিই মূলধারার ফাতওয়া সাইটগুলোতে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং প্রায়শই হারাম ও শিরকের সাথে সম্পর্কিত বলে ফাতওয়া দেওয়া হয়।
সাধারণ রেফারেন্স:
- কোরআনুল কারীম: আল্লাহর কালামের বরকতের মূল উৎস।
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে মা'আরিফুল কোরআন: এই তাফসীর গ্রন্থগুলোতে আয়াতের ব্যাখ্যায় মোয়াক্কেল হাসিলের কোনো বর্ণনা নেই।
- ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া / ফাতাওয়া আলমগীরী): হানাফী ফিকহের অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ। এটি বা এর মতো ফিকহের কোনো গ্রন্থে মোয়াক্কেল হাসিলের পদ্ধতির অনুমোদন পাওয়া যায় না, বরং এ ধরনের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়।
- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ আলেমদের ফাতাওয়া: জিন্নদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন বা তাদের বশীভূত করা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে যে, তা জায়েজ নেই এবং এটি শিরক বা হারাম হওয়ার কারণ।
- আধুনিক ফাতওয়া বোর্ডসমূহ (যেমন: Islamqa.info, Darul Ifta Deoband, Darul Ifta Jamia Binoria, AskImam.org): এসব সাইটেও মোয়াক্কেল বা জিন্ন বশীভূত করার আমলকে সাধারণত বিদ'আত, হারাম বা শিরকের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে এর থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উপসংহারে, সুরা গাফির-এর ১৯ আয়াতের আমল করুন আল্লাহর উপর ভরসা রেখে, তাঁরই কাছে সাহায্য চেয়ে। মোয়াক্কেল হাসিলের ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকুন।