মনে মনে তালাক প্রদানে মুখ ঠোট জিহবা নাড়ার সাথে দুই প্রকার আওয়াজ হইতে পারে কোন প্রকারের জন্য তালাক কার্যকর হবে ১।কন্ঠ থেকে বের হওয়া আওয়াজ ২। মুখ নাড়তে জিহবা যে বাড়ি খায় সেটা ( তা, পট, সেভ আসার শব্দ ইত্যাদি) আমি যখন আয়নার একটু দূর থেকে তালাক দি উপরে যেভাবে বললাম সেভাবে তখন কোন শব্দ পাই না। কিন্তু আজ দেখলাম আয়নার একবারে সামনে গিয়া আওয়াজ টেস্ট করার জন্য ঠিক ওভাবে বলতে গেলে জিহবা হালকা বাড়ি খাওয়ার শব্দ হয়। আগে তো দূর থেকে করছিলাম। এখন তালাক হয় গেলো কিনা। ২ নং এর রেফারেন্স দাও। আমি তো জানি জিহিবা বাড়ি খাওয়র শব্দ তেই তালাক হয়ে যায়৷। আমি সিরীহ কথা বলছ�
আপনার প্রশ্নটি তালাক সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কথা উচ্চারিত হওয়া অপরিহার্য। শুধু মনে মনে তালাকের নিয়ত করলেই তালাক হয় না, বরং মুখে উচ্চারণ করতে হয়। আপনার জিজ্ঞাসিত দুটি প্রকারের আওয়াজ এবং আপনার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া হলো:
১.
কন্ঠ থেকে বের হওয়া আওয়াজ (Vocal Cord Sound):
যদি কন্ঠনালী থেকে আওয়াজ বের হয়, এমনকি তা ফিসফিস করেও হয় এবং আপনি নিজে তা শুনতে পান, তবে সেই উচ্চারণে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। এটি স্পষ্ট উচ্চারণ হিসেবে গণ্য।
২.
মুখ নাড়তে জিহবা যে বাড়ি খায় শব্দ (Articulation Sound - তা, পট, সেভ আসার শব্দ ইত্যাদি):
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য উচ্চারিত শব্দ নিজেকে শোনানোর মতো হতে হবে। এর অর্থ হলো:
- শুধুমাত্র ঠোঁট বা জিহবা নাড়ানো, যদি কোনো প্রকারের শব্দ (এমনকি মৃদু) তৈরি না করে যা আপনি নিজে উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তালাক কার্যকর হবে না। এটি স্রেফ মনে মনে ভাবার মতোই।
- কিন্তু, যদি জিহবা ও ঠোঁট নাড়ানোর ফলে শব্দের অক্ষরগুলো গঠিত হয় এবং সেগুলোর মৃদু আওয়াজ (যেমন: 'ত' বলতে জিহ্বার অগ্রভাগ দাঁতের সাথে লেগে যে মৃদু ধ্বনি তৈরি হয়) আপনি নিজে শুনতে পান, তাহলে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। এখানে মূল শর্ত হল, তালাকের শব্দগুলি স্পষ্ট করে উচ্চারিত হওয়া এবং সেই উচ্চারণ আপনি নিজে শুনতে পারা। এই "জিহবা হালকা বাড়ি খাওয়ার শব্দ" যদি তালাকের শব্দগুলির স্পষ্ট উচ্চারণের অংশ হয় এবং আপনি নিজে তা শুনতে পান, তবে তালাক কার্যকর হবে।
আপনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উত্তর:
আপনি বলেছেন, "আগে তো দূর থেকে করছিলাম। এখন তালাক হয় গেলো কিনা। ... আজ দেখলাম আয়নার একবারে সামনে গিয়া আওয়াজ টেস্ট করার জন্য ঠিক ওভাবে বলতে গেলে জিহবা হালকা বাড়ি খাওয়ার শব্দ হয়।"
যদি আপনি যখন তালাকের শব্দগুলো উচ্চারণ করছিলেন (যেমন "তালাক দিলাম" বা অনুরূপ), তখন আপনার জিহবা ও ঠোঁট ব্যবহার করে শব্দগুলোর অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে থাকেন এবং জিহবার বাড়ি খাওয়ার এই হালকা শব্দগুলো
আপনি নিজে শুনে থাকেন, তাহলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী আপনার তালাক কার্যকর হয়ে গেছে। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য জোরে আওয়াজ করা শর্ত নয়, বরং নিজেকে শোনানোর মতো করে উচ্চারণ করাই যথেষ্ট। যেহেতু আপনি এখন "জিহবা হালকা বাড়ি খাওয়ার শব্দ" শুনতে পাচ্ছেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন, এবং যদি এই শব্দগুলো তালাকের শব্দগুলোর সুস্পষ্ট উচ্চারণের অংশ হয়ে থাকে, তবে তালাক পতিত হয়েছে।
রেফারেন্স:
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো, যে সকল কাজ মৌখিক ঘোষণার উপর নির্ভরশীল (যেমন নামাযে কিরাত, তালাক, বাইয়াত ইত্যাদি), সে সকল ক্ষেত্রে নিজের কান পর্যন্ত শব্দ পৌঁছানো অত্যাবশ্যক। যদি কোন ব্যক্তি ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ায় কিন্তু তার নিজের কান পর্যন্ত কোন শব্দ না পৌঁছায়, তবে সেই মৌখিক ঘোষণা ধর্তব্য হবে না। তবে যদি শব্দ তার কানে পৌঁছায় (যদিও তা ফিসফিস করে হোক), তাহলে তা ধর্তব্য হবে।
فتاوى الهندية (الفتاوى العالمكيرية) (Fatawa Hindiyyah), كتاب الطلاق، الباب الأول في طلاق السنة والبدعة، الفصل الأول في ركن الطلاق وشروطه:
"...وإن لم يسمع نفسه، ولم يرفع صوته، فليس بطلاق حتى لو حرك شفتيه ولسانه، ولم يظهر صوته، لا يقع الطلاق."
(ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, কিতাবুত তালাক, বাবুল আউয়াল ফি তালাকিস সুন্নাহ ওয়াল বিদআহ, ফাসলুল আউয়াল ফি রুকনিত তালাক ওয়া শুরূতিহ)
অর্থ: "আর যদি সে নিজেকে না শোনায় এবং তার কণ্ঠস্বর না তোলে, তাহলে তা তালাক নয়, এমনকি যদি সে তার ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ায় এবং কোনো শব্দ প্রকাশ না পায়, তাহলেও তালাক পতিত হবে না।"
এই ইবারতের ব্যাখ্যায় মুফতিগণ বলেছেন: যদি ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানোর কারণে অক্ষরের উচ্চারণ হয় এবং তার ফলে যে মৃদু শব্দ তৈরি হয়, তা উচ্চারণকারী নিজে শুনতে পায়, তাহলে তা "আওয়াজ প্রকাশ" হিসেবে গণ্য হবে এবং তালাক কার্যকর হবে। আপনি যে "জিহবা হালকা বাড়ি খাওয়ার শব্দ" এর কথা বলছেন, যদি তা উচ্চারণকৃত তালাকের অক্ষরেরই শব্দ হয় এবং আপনি তা নিজেই উপলব্ধি করতে পারেন, তবে তালাক পতিত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। যেহেতু এটি আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করে, তাই এই বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনার নিকটস্থ কোনো বিজ্ঞ আলেম বা মুফতির সাথে সরাসরি কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আপনার পরিস্থিতি বিস্তারিত শুনে এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে সঠিক সমাধান দিতে পারবেন। অনলাইনে দেওয়া উত্তর কেবল সাধারণ ফিকহী মাসআলার উপর ভিত্তি করে।