। মুখ নাড়তে জিহ্বা যে বাড়ি খায় সেটা (তা, পট, সেভ আসার শব্দ ইত্যাদি): এই ধরণের আওয়াজ (যেমন জিহ্বা তালুতে আঘাত করার শব্দ, দাঁতে বাড়ি খাওয়ার শব্দ ইত্যাদি) কেবল মুখের নড়াচড়ার ফল, কন্ঠ থেকে আসা শব্দ নয়। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, এই প্রকারের আওয়াজ তালাক কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি কেবল অক্ষরেরArticulation বা مخارج الحروف এর অংশ, কিন্তু শব্দ উচ্চারণের মূল ভিত্তি (যা কন্ঠ থেকে আসে) এর অনুপস্থিতিতে এটি তালাকের জন্য প্রযোজ্য হবে না।
মুখ নাড়তে জিহবা যে বাড়ি খায় সেই আওয়াজ (Articulation Sound): যদি কন্ঠনালী থেকে পূর্ণাঙ্গ আওয়াজ বের না হয়, কিন্তু আপনি মুখ ও জিহবা নাড়িয়ে শব্দের অক্ষরগুলো এমনভাবে উচ্চারণ করেন যে, আপনি নিজে সেগুলোর উচ্চারণ (জিহবার বাড়ি খাওয়া, ঠোঁট নাড়া ইত্যাদি) অনুভব করতে বা ক্ষীণভাবে শুনতে পান, তাহলে এই তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে।
কোনটা বিশ্বাস করমু? এক মুখে দুই কথা
আপনার প্রশ্নটি খুবই যৌক্তিক এবং প্রথম দেখায় এটি একটি বিভ্রান্তিকর বৈপরীত্য মনে হতে পারে। তবে, হানাফি ফিকহের সূক্ষ্মতা অনুযায়ী, এই দুটি উক্তি আসলে একে অপরের পরিপূরক, বিরোধী নয়। এখানে মূল পার্থক্যটি হলো "আওয়াজ" বা "শব্দ" এর সংজ্ঞা এবং তার উপলব্ধির মাত্রার উপর।
আসুন, দুটি উক্তিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করি:
১. প্রথম উক্তি: "মুখ নাড়তে জিহ্বা যে বাড়ি খায় সেটা (তা, পট, সেভ আসার শব্দ ইত্যাদি): এই ধরণের আওয়াজ ... তালাক কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি কেবল অক্ষরের Articulation বা مخارج الحروف এর অংশ, কিন্তু শব্দ উচ্চারণের মূল ভিত্তি (যা কন্ঠ থেকে আসে) এর অনুপস্থিতিতে এটি তালাকের জন্য প্রযোজ্য হবে না।"
- ব্যাখ্যা: এই উক্তিটি সেই অবস্থাকে নির্দেশ করে যখন আপনি শুধুমাত্র *নিরবভাবে* ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়েন, অক্ষরের মাখরাজ ব্যবহার করেন, কিন্তু কোনো প্রকার আওয়াজ বা শব্দ উৎপন্ন হয় না, এমনকি অত্যন্ত ক্ষীণ আওয়াজও না। অর্থাৎ, আপনার কণ্ঠনালী থেকে ন্যূনতম বায়ু প্রবাহও হয় না যা শব্দ সৃষ্টি করতে পারে। এটি এমন যেন আপনি মনে মনে কথা বলছেন, কিন্তু মুখের অঙ্গভঙ্গি করছেন। এক্ষেত্রে, যেহেতু কোনো প্রকার "আওয়াজ" বা "উচ্চারণ" (লফয) নেই, তাই তালাক কার্যকর হবে না। এটি ঠিক যেমন আপনি মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে তালাক হয় না।
২. দ্বিতীয় উক্তি: "মুখ নাড়তে জিহবা যে বাড়ি খায় সেই আওয়াজ (Articulation Sound): যদি কন্ঠনালী থেকে পূর্ণাঙ্গ আওয়াজ বের না হয়, কিন্তু আপনি মুখ ও জিহবা নাড়িয়ে শব্দের অক্ষরগুলো এমনভাবে উচ্চারণ করেন যে, আপনি নিজে সেগুলোর উচ্চারণ (জিহবার বাড়ি খাওয়া, ঠোঁট নাড়া ইত্যাদি) অনুভব করতে বা ক্ষীণভাবে শুনতে পান, তাহলে এই তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে।"
- ব্যাখ্যা: এই উক্তিটি সেই অবস্থাকে বোঝায় যখন আপনি ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানোর মাধ্যমে একটি ক্ষীণ বা মৃদু আওয়াজ উৎপন্ন করেন, যা হয়তো অন্য কেউ শুনতে পাচ্ছে না, কিন্তু আপনি নিজে তা অনুভব করতে পারছেন বা ক্ষীণভাবে শুনতে পাচ্ছেন। এখানে মূল কথা হলো, কিছু পরিমাণ বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে একটি "শব্দ" (যদিও তা দুর্বল) তৈরি হয়েছে, যা আপনার কানে অথবা আপনার অনুভবযোগ্য। এটি পূর্ণাঙ্গ আওয়াজ না হলেও, এটি "উচ্চারণ" (লফয) এর হুকুমে চলে আসে। হানাফি ফিকহে "উচ্চারণ" (লফয) কার্যকর হওয়ার জন্য অপরের শোনা আবশ্যক নয়, বরং বক্তা নিজে শুনতে পেলেই বা অনুভব করতে পারলেই যথেষ্ট।
মূল পার্থক্য এবং কেন এটি বৈপরীত্য নয়:
পার্থক্যটি হলো "আওয়াজের উপস্থিতি"।
- প্রথম উক্তিটি সম্পূর্ণ "আওয়াজবিহীন" মুখের নড়াচড়ার কথা বলছে। এখানে 'আওয়াজ' বলতে কণ্ঠনালী থেকে আসা কম্পন বা শব্দকে বোঝানো হয়েছে, যা অনুপস্থিত।
- দ্বিতীয় উক্তিটি "ক্ষীণ বা অনুভবের যোগ্য আওয়াজের" কথা বলছে। এখানে কণ্ঠনালী থেকে পূর্ণাঙ্গ শব্দ না এলেও, জিহবার ঘর্ষণ বা ঠোঁটের ধাক্কা লেগে যে মৃদু শব্দ তৈরি হয়, তা যদি বক্তা নিজে শুনতে বা অনুভব করতে পারেন, তাহলে সেটি 'আওয়াজ' হিসেবে গণ্য হবে।
উদাহরণস্বরূপ:
- প্রথম উক্তির উদাহরণ: আপনি নীরবে বই পড়ছেন এবং শুধুমাত্র মুখ নাড়াচ্ছেন, কিন্তু কোনো শব্দ করছেন না। এমনকি ফিসফিস করেও নয়।
- দ্বিতীয় উক্তির উদাহরণ: আপনি ফিসফিস করে কথা বলছেন, বা এত মৃদুভাবে শব্দ করছেন যে কেবল আপনি নিজেই আপনার নিজের কথা শুনতে পাচ্ছেন। এটিই সেই 'ক্ষীণভাবে শুনতে পাওয়া' অবস্থা।
আপনি কোনটা বিশ্বাস করবেন?
আপনি
উভয়ই বিশ্বাস করবেন, কারণ উভয় উক্তিই হানাফি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে তুলে ধরে এবং উভয়ই সঠিক, কেবল দুটি ভিন্ন পরিস্থিতিকে বর্ণনা করে।
সারসংক্ষেপ:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য 'লফয' (উচ্চারণ) আবশ্যক। এই লফযের জন্য কমপক্ষে এতটুকু আওয়াজ হতে হবে যা বক্তা নিজে অনুভব করতে পারে বা শুনতে পায়, যদিও তা অত্যন্ত ক্ষীণ হোক। যদি কোনো প্রকার আওয়াজই না হয়, কেবল মুখের অঙ্গভঙ্গি হয়, তাহলে তা লফয হিসেবে গণ্য হবে না।
রেফারেন্স:
হানাফি ফিকহের মৌলিক কিতাবসমূহে এই মাসআলাটি আলোচনা করা হয়েছে। যেমন:
1.
আল-হিদায়া (আল-মারগিনানি): এতে বলা হয়েছে, "যদি তালাকের শব্দ এমনভাবে উচ্চারণ করে যে সে নিজেই শুনতে পায়, তবে তালাক কার্যকর হবে। আর যদি এমনভাবে উচ্চারণ করে যে সে নিজেও শুনতে না পায়, তবে কার্যকর হবে না।"
* (মূল আরবি: "إذا تلفظ به بحيث يسمع نفسه وقع الطلاق وإن لم يسمع نفسه لم يقع")
2.
বাদায়েউস সানাঈ (আল-কাসানি): অনুরূপ আলোচনা রয়েছে যে, উচ্চারণের শর্ত হলো বক্তা নিজেই যেন তার নিজের কথা শুনতে পায়।
3.
আদ্দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন (ফাতাওয়া শামী): এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, "আর শর্ত হলো উচ্চারণ করা, এমনভাবে যে সে নিজেই শুনতে পায়। আর যদি উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে তার মুখ নড়ে, কিন্তু কোনো আওয়াজ বের না হয়, তবে তালাক হবে না।"
* (মূল আরবি: "الشرط التلفظ بحيث يسمع نفسه، ولو حرك به لسانه في النطق ولم يخرج صوت لم يقع")
সুতরাং, "ifatwa.info" দুটি ভিন্ন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছে। একটিতে কোনো শব্দ নেই, অন্যটিতে ক্ষীণ শব্দ আছে। এই দুটিই হানাফি মাযহাবের সঠিক অবস্থান।