আসসালামু আলাইকুম, শাইখ
মুরুব্বি মানুষেরা বা যারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ইলম প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্ত নন কিন্তু যেকোন ভাবেই ইলমী কাজে সহায়তা করলে( যেমন, কোন ইলমী কোর্সের শেয়ারের মাধ্যমে কাউকে জানালে, মসজিদে মাদ্রাসায় নির্মানে সদাকাহ করলে, যেকোন ভাবে যেকোন ভাবেই তালীবুল ইলমকে বিভিন্ন কিছু সদকা করলে, হাদিয়া দিলে, মাদ্রাসার ডাইনিং, পানি, বিল্ডিং, শিক্ষকের বেতন ইত্যাদি ইলমী কাজের প্রচার প্রসার সংক্রান্ত যেকোন কাজেই হাদিয়া এবং দান সদাকা করলে) তারা তো একই সাথে সেই সওয়াবও পাবে না, যেটা বলা হয়েছে হাদীসে মৃত্যুর পরের উপকারী ইলমের অবিচ্ছিন্ন যে সওয়াবটা সে সওয়াবও পাবেনা শাইখ?
অর্থাৎ, (১)একই সাথে মৃত্যুর পর সেই উপকারী ইলমের সওয়াব পাবেন।
একই সাথে,
(২) হাদিয়া এবং দান সদাকার সওয়াবও পাবেন!!
মৃত্যুর পরের অবিচ্ছিন্ন তিনটি আমলের সওয়াবের পৌঁছানোর দুটোই তো তাহলে এর মাধ্যমে হয়ে যাচ্ছেনা শাইখ!
আর ইসলেও সওয়াবের মাধ্যমেও তো কবরবাসীকে আমল পৌঁছানোও যায় সুবহানাল্লাহ।
ওয়ালাইকুমুশ সালাম। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ও রেফারেন্সসংবলিত উত্তরসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হল —
ফিকহি সিদ্ধান্ত (সংক্ষিপ্ত)
1) কোনো ব্যক্তি সরাসরি তালিম না দিলেও, যদি সে কোনোভাবে ইলমী কাজে সহায়তা করে — যেমন মাদ্রাসা/মসজিদের নির্মাণে অনুদান, শিক্ষক বেতন চালানো, ছাত্রদের ভাতায় সহায়তা, ইলমী বই দান, মাদ্রাসার পানিসুবিধা বা রান্নাঘরের ব্যয় ইত্যাদি — এবং সেই অনুদান/হাজিয়া ইলমের প্রচার ও টিকে থাকার উদ্দেশ্যে বা জানাজানি ব্যবহার হয়, তাহলে সেটাকে হাদিয়া/সদাকা-জরিয়্যাহ (sadaqah jariyah/waqf ইত্যাদি) হিসেবে নেওয়া হবে এবং দানকারীকে মৃত্যু পরেও যতক্ষণ পর্যন্ত ওই ইলম অন্যদের উপকারে থাকে ততদিন পর্যন্ত সওয়াব পৌঁছবে। (ইলম নাফিই - ongoing beneficial knowledge) — কারণ এই কাজগুলোই হাদীসের তিনটি অব্যাহত আমলের একটি। (হাদীস: "إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ..." — সাহিহ মুসলিম।)
2) একই সময়ে “সদাকা/হাদিয়া দেয়ার” আমলটিরও সওয়াব আলাদা রূপে পাওয়া যায় যদি দাতা তার দানকে ইবাদত (সদাকা/ওয়াকফ/ইত্যাদি) হিসেবে নিয়েছে বা জানত যে তা ইলমী কাজে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ:
- যদি দানকারী স্পষ্টভাবে সদাকা/উম্মাহসেবা/মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ দিয়েছেন, তবে তিনি সেই সদাকার সওয়াবও পান এবং তা অব্যাহত সওয়াবে পরিণত হয় যতক্ষণ পর্যন্ত ফল বহিত থাকে।
- যদি কেবল সাধারণভাবে উপহার দিয়েছেন (নিয়ত ইবাদত হিসেবে না) এবং দাতা জানা বা ইচ্ছা ছাড়া গ্রহণকারী পরে সেটি ইলমী কাজে ব্যয় করেন, তবে ফিকহে নীয়ত (niyyah) গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় মূল দাতার জন্য অবিরত সওয়াব আদৌ যাবে কি না—এই বিষয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেরক আছে; সাধারণত যদি দাতা উদ্দেশ্য নিয়েই দান করে হয় তবেই পুর্ণ সওয়াব নিশ্চিত। (নিয়ত সম্পর্কিত নীতিঃ "الأعمال بالنيات" — মাশহুর নীতি।)
3) কবরবাসীর জন্য আমল পৌঁছে দেয়া:
- হানাফি মতানুসারে জীবিত নিজের তরফ থেকে সদাকা বা ওয়াকফ পূর্বে কবরবাসীর নামে দান করলে সেই সওয়াব মরহুমের জন্য পৌঁছে যায় — এবং এটি পূর্বোক্ত ধারায় গণ্য। (অর্থাৎ মৃতের জন্য সদাকা করা যায় ও সেটি তাদের উপকারে যায়।)
রেফারেন্স (হানাফি সূত্রসমূহ)
- হাদীস (আসল সূত্র): সাহিহ্ মুসলিম — "إذا مات الإنسان انقطع عمله..." (Kitab al-Wasaya / Kitab al-Jana'iz/باب ما ينفع الميت) — বুনিয়াদি প্রমাণ যে ইলম নাফি ও সদাকা-জারিয়া মৃত্যুর পরও সওয়াব দেয়।
- Durr al-Mukhtār (الدر المختار) — باب الوقف و الصدقة الجارية: মাদ্রাসা/মسجد/وقف ইত্যাদি ও তাদের দানকারীর অনন্ত সওয়াব বিষয়ে হানাফি স্থাপনা।
- Radd al-Muhtar (ردّالمُختار) عَلَى الدُّرّ المُختار — Ibn Abidin: باب الوقف والصدقات وما يتعلق بها — হানাফি মুফাসসাল ব্যাখ্যা (sadaqah jariyah, waqf, অনুদানের অংশগ্রহণ ও সওয়াব বিধান)।
- Al-Fatawa al-Hindiyya / Fatawa-e-Alamgiri — باب الوقف والصدقة: সাবেক উপকরণে অধিকার ও দানকারীর সওয়াব সম্পর্কিত হানাফি ফাতাওয়া।
সংক্ষিপ্ত উপসংহার
- সংক্ষেপে: হ্যাঁ — আপনি যেভাবে ইলমীর কাজে সহায়তা করেছেন সেটি যদি সদাকা/ওয়াকফ/ইত্যাদি হিসেবে হয়ে থাকে বা উদ্দেশ্যতঃ ইলমের জন্য করা হয়, আপনি মৃত্যুর পরেও ইলম নাফি (অবিচ্ছিন্ন সওয়াব) পাবেন। এবং একই সঙ্গে, যেই দানটি করেছেন তার জন্য সদাকা/হাদিয়ার সওয়াবও প্রযোজ্য হবে (বিশেষত যদি আপনার নিয়ত তা ছিল)। যদি নিয়ত না থাকে, তখন বিস্তারিত পরিস্থিতি অনুযায়ী ফিকহি বিচারে পার্থক্য আসে — বিস্তারিত жағдайда নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে ফতায়া নেয়া উত্তম।
রেফারেন্স হিসেবে উল্লিখিত হানাফি বইগুলো দেখবেন; প্রয়োজন হলে আমি নির্দিষ্ট হাদিস/ফিকহি প্যা-রাগ্রাফ উদ্ধৃত করে দিতেই পারি।