🏠 Home

iFatwa Q&A (Hanafi Fiqh)

আসসালামু আলাইকুম হুজুর।আশা করি ভালো আছেন।হুজুর আমার বয়স ১৪ বছর।আর আমাদেরউপরে অনেক বার গোসল ফরয হয়েছে। আর আমরা সকল সঠিক মাসআলা না জানার কারণে অনেক সমস্যাতে আছি।আবার সময় পাচ্ছি না মসজিদের ইমাম এর সাথে এইগুলা জিজ্ঞেস করতে। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ রইলো এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য- ১.ফরয গোসলে কান ও নাভি তে কিভাবে পানি পৌছাবো?পদ্ধতি টা বললেই হবে। ২.ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় কিভাবে পানি পৌছিয়েদিবো?আমার চুল তো মোটামুটি বড়?এটারও পদ্ধতি টা বললেই হবে। ৩.ফরয গোসল করার পরও যদি দেখি দেহে নাপাকি দেহে দৃশ্যমান তবে কি গোসল হবে না? ৪..দেহের লোম বেশি হলেও কি শুধু পানি ঢাললেই হবে,নাকি হাল্কা ঘষতে হবে? ৫.ফরয গোসলে কুলি করার জন্য ২ হাতে একত্রে পানি নিয়ে কুলি করি আমি যাতে পুরো মুখ ভিজে যায়।এটা কি অপচয়? নাকি আমি ১ হাতের কোষে নিলে অপচয় হবে না। ৬.হুজুর হাত -পা এর নখের ভিতরেও কি পানি দেওয়া লাগবে? ৭। আমার যদি মনে না থাকে বা লক্ষ্য না থাকে যে কোথায় নাপাকি লেগেছে তবে ফরয গোসলে কি করবো? ৮.আমাদের বাসার বাথরুম দৈঘ্যে বড় হলেও প্রস্থে ছোট।তাই শাওয়ার দিয়ে গোসল করার সময় নাপাকি ধোয়ার সময় বালতির পানি তে অনেক ফোটা পানিপড়ে তাই এটা কি নাপাক হবে? ৯.হুজুর দয়া করে আমাকে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন -বগল,পান এর মাঝের ফাক, কান, নাভি,চোখের ভ্রু,মোচ এইভাবে অঙ্গ গুলো র নাম বলবেন পয়েন্ট আকারে তাহলে ফরয গোসলে সুবিধা হয়।মানে জেগুলো তে সতর্কতার সহিত পানি দেওয়া লাগবে। ১০।হুজুর দাতের মাড়ি, আর নাকের লোম এও কি পানি পৌছানো লাগবে?এটা কিভাবে করবো?আর নাকের নরম অংশ কোনটি এটা তো জানা নেই। ১১.হুজুর গোসল ফর‍য হলে কি কয়েকবার প্রস্রাব করার জরুরি?কারন ভিতরে
ওয়ালাইকুম আসসালাম। নিচে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত ও সরলভাবে উত্তর দিলাম (সূত্র শেষে দেওয়া হলো) —

1) কান ও নাভিতে পানি পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি
- কান: গোসলের সময়ে এক আঙুল ভেজা করে কানের ভেতরে হালকাভাবে ঢুকিয়ে (ইনডেক্স ফিঙ্গার বা বড় আঙুল) একবার ভেজে বের করে ও খোলার পিছনের অংশটিও মুছতে হবে। বাইরের অংশও পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
- নাভি: নাভির ভিতর টান দিয়ে বা আঙ্গুল দিয়ে পানি ঢোকাতে হবে এবং যে অংশে ধুলো/ময়লা থাকে সেখান খোলা করে পানি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে যাতে পানি নাভির গভীরে পৌঁছায়।

2) চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানোর পদ্ধতি (লম্বা চুল হলে)
- গোসলের সময় মাথার ওপর থেকে প্রচুর পানি ঢালুন যাতে পানি স্বাভাবিকভাবে চুলের গোড়ায় নামতে পারে।
- চুল মোটা/বদ্ধ হলে আঙুল দিয়ে চুলের ফালি ফালি ভাগ করে বা আঙুল প্রবেশ করিয়ে স্কাল্পে পানি পৌঁছে দিন।
- ভাঁজ, চুলের প্লেইট বা বহুদইবদ্ধ হলে প্লেইট খুলে পানি পৌঁছে দেওয়া উত্তম; যদি প্লেইট এমনভাবে বাঁধা থাকে যে পানি স্কাল্পে পৌঁছায় না, তাহলে পানি পৌঁছে দেওয়া বাধ্য। (পর্যাপ্ত পানি না পৌঁছালে গোসল সম্পূর্ণ হবে না।)

3) গোসলের পর দেহে দৃশ্যমান নাপাক থাকলে কি গোসল হবে না?
- যদি গোসলের পরে দেহে বাস্তব নজাসা (নাপাক) দৃশ্যমান থাকে এবং সেটা গোসলের সময় ধোয়া হয়নি, তাহলে ঐ অংশ আলাদা করে ধুতে হবে। গোসল নিজেই তখন শুদ্ধ গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সেই নাজায়েজ অংশ ছাড়া থেকে যায়; ফলে নামাজ ইত্যাদি করার আগে সেই নাপাক অংশটি সরাতে হবে। যদি গোসলের পরে আপনি দেখতে পান কিন্তু আগেই ভালোভাবে ধোয়া হয়ে গিয়েছে (শুধু দাগ রয়ে গেছে) – সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে; তবে নিরাপদ হচ্ছে পুনরায় ধুয়ে নেয়া।

4) দেহে লোম বেশি হলে শুধু পানি ঢাললেই হবে, নাকি হালকা ঘষতে হবে?
- মূলত পানি যেন সরাসরি ত্বকে পৌঁছায় এটাই প্রয়োজন। যদি লোম এতমাত্রায় ঘনীভূত যে পানি ত্বকে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তখন আঙুল দিয়ে হাল্কা ঘষে বা চুল ফালি করে যাতে পানি স্কিনে পৌঁছায়। যদি পানি সহজে স্কিনে পৌঁছে, বিশেষ ঘষার প্রয়োজন নেই।

5) গোসলের সময় কুলি করার জন্য দুই হাতে একসাথে পানি নেওয়া কি অপচয়?
- দরকারি পরিমাণ পানি নেওয়া উচিত; অত্যধিক ব্যবহার (ইস্রাফ) পরিহার করা ভাল। দুই হাতে পানি নিয়ে কুলি করলে যদি তা প্রয়োজনের অধিক না হয়, তাহলে অপচয় নয়। এক হাতে নিলেও ঠিক আছে যদি মুখ পুরো ভিজে যায় ও নাক-গলা ভালোভাবে ধুয়ে যায়। হিসাবমত পরিমাণ ব্যবহার করুন—প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত, অতিরিক্ত নয়।

6) হাত-পার নখের ভিতরেও কি পানি দেওয়া লাগবে?
- নখ যদি স্বাভাবিকভাবে পাতলা ও স্বচ্ছ্‌ থাকে এবং নখ তলে পানি সহজে পৌঁছে যায়, আলাদা করে না। কিন্তু নখ এত লম্বা বা ময়লা যা পানি ত্বকে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তখন আঙুলের নখের তলায় আঙুল ঢুকিয়ে বা অন্য আঙ্গুল দিয়ে নখের তলা পরিষ্কার করে পানি পৌঁছে দিতে হবে। মূল মাপকাঠি: ত্বকে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করা।

7) যদি মনে না থাকে কোথায় নাপাকি লেগেছে, তাহলে কি করব?
- যেখানে নাপাকি ছিল নিশ্চিত না হলে গোসলটা পুরোপুরি মনোযোগ করে করুন যাতে সমস্ত শরীর ভালোমতো ধুয়ে নেয়া হয়। পরে যদি মনে পড়ে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নাজায়েজ ছিল, শুধু সেই অংশ আলাদা করে ধুয়ে নিন। অনিশ্চয়তার কারণে গোসল বাতিল হয় না যদি গোসল সম্পূর্ণ ও সঠিকভাবে করা হয়।

8) বাথরুমে শাওয়ার দেয়ার সময় বালতির পানিতে ফোটা পানি পড়লে সেটা নাপাক হবে কি?
- জল নাজাইল হলে পুরো পানি নি¤œ করলে কি বিশুদ্ধ থাকবে না—হানাফি উস্তাদের মাপকাঠি: যদি নাপাকীয় বস্তু পরিমাণে পানার স্বাদ/রং/গন্ধ পরিবর্তন না করে ও তা অপ্রতুল পরিমাণ হয়, সেই পানি সাধারণত নাপাক গণ্য হয় না। কিন্তু যদি স্পষ্ট নাজায়েজের বড় ফোঁটা পড়ে এবং তা দেখে বোঝা যায়, তাহলে সে পানি নাপাক হবে এবং বদলাতে হবে। নিরাপদ থাকতে পরিষ্কার পানি ব্যবহার করা উত্তম।

9) ফরয গোসলে বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া উচিৎ অঙ্গসমূহ (পয়েন্ট আকারে)
- মাথার উপরের চামড়া ও চুলের গোড়া (স্কাল্প)
- মুখ: ঠোঁট, ঠোড়ার নিচ, মুখ গহ্বর (মুখের ভেতর ভালোভাবে কুলি)
- নাকের ভেতর (নাক ধৌত)
- কান: ভেতর ও পিছনের অংশ
- ঘাড় ও পিছনের অংশ
- বগল (অর্কিটস) ও এর ফোল্ড
- বুকের মাঝখান ও স্তনদের নিচের ফাঁক
- নাভি ও নাভির ভিতর
- যোনি/লিঙ্গ ও পার্শ্ব, পরінеয়াম অঞ্চল, অগ্ন্যপ্রান্ত (বাট)
- জোয়ানের মধ্যে ও থাই-এর ফাঁক
- হাত ও আঙুলের ফাঁক, আঙুলের নখ তলা
- পা, পায়ের আঙ্গুলের ফাঁক ও নখ তলা
(প্রতিটি ফাঁক ও যেকোন ভাঁজ যেখানে পানি আটকে থাকে সেখানটি নিশ্চিতভাবে পানি পৌঁছে দিন।)

10) দাঁতের মাড়ি ও নাকের লোমে কি পানি পৌছাতে হবে? নাকের নরম অংশ কোনটি?
- দাঁতের মাড়ি: মুখ কুলি করার সময় মুখের ভেতরে পানি ঘোরাতে হবে যাতে দাঁত ও মাড়ির পাশে পানি পৌঁছায়; বিশেষ করে যদি মাড়িতে ময়লা থাকে তবে আঙুল বা দাঁত ব্রাশ করে পানি দিয়ে কুলি করুন।
- নাকের লোম/নাকের নরম অংশ: নাক ধোয়ার সময় (ইস্তিনশাক) পানিতে নিঃশ্বাস টেনে নাকের ভিতরে পানি ঢুকিয়ে (হাল্কা করে) পরে বের করে ফেলুন—এভাবে নাকের ভেতরের অংশ (মিউকাস মেমব্রেন পর্যন্ত) পরিষ্কার হয়। নাকের ভেতরের নরম অংশ বলতে নাসার ভেতরের গহ্বর; শুধু বাহিরের নাকের চুল নয়, ভেতরেও পানি পৌঁছানো উচিত। নাসার গহ্বর পর্যন্ত জোরপূর্বক ঢুকালে অস্বস্তি হলে হালকাভাবে করুন যতটুকু সম্ভব।

11) গোসল ফরজ হলে কি কয়েকবার প্রস্রাব করা জরুরি?
- না। গোসল ফরজ হওয়ার জন্য প্রস্রাব কয়েকবার করা বাধ্যতামূলক নয়। ফরজ হওয়ার কারণ (যেমন জনবাহ্যতা/মراحل) ঘটলে সোজাসুজি গোসল করা প্রয়োজন; অতিরিক্ত প্রস্রাব করা বা বারবার প্রস্রাব করার কোনো শর্ত নেই। যদি মনে হয় মূত্রথলি পুরো খালি হয়নি এবং মূত্র আটক আছে, তাহলে একবার প্রস্রাব করে নিশ্চয়তা নিয়ে গোসল করতে পারেন, কিন্তু এটি ফরজ নয়—শরীরের স্বচ্ছন্দতার বিবেচনায় করা যায়।

সূত্র: আল‑হিদায়া (কিতাবুত‑তাহারা) — হানাফি ফিকহ প্রসঙ্গে।