"তোমাকে তালাক দিলাম এই কথাটা যদি আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোট নেড়ে বলি। পরিবেশ ঠান্ডা কোন আওয়াজ এক ফোটাও কানে যায় নাই, ফতোয়ার কিতাবে তো আছে জিহবা আর ঠোট নড়লেই তালাক হয়ে যায়, আমি যে নিজের কানে শুনি নাই তাহলে কি তালাক হবে? একটু আগে শুরুতে একই প্রশ্ন করলাম তখন বললি হবে তখন তো বলছিলাম ১ ফোটা আওয়াজ ও বের হয় নাই।২। আয়নায় দেখে বলার কারনে মনে মনে বলাতে কোন চেঞ্জ আসে? আর ফতোয়া একটা তো দেখালি যে মুখ আর ঠোট জিহিবা নাড়াই যথেষ্ট
আপনার প্রশ্নটি বেশ সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ, এবং হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে এর উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। আপনার প্রতিটি প্রশ্নের আলাদাভাবে জবাব দেওয়া হচ্ছে:
১. "তোমাকে তালাক দিলাম এই কথাটা যদি আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোট নেড়ে বলি। পরিবেশ ঠান্ডা কোন আওয়াজ এক ফোটাও কানে যায় নাই, ফতোয়ার কিতাবে তো আছে জিহবা আর ঠোট নড়লেই তালাক হয়ে যায়, আমি যে নিজের কানে শুনি নাই তাহলে কি তালাক হবে? একটু আগে শুরুতে একই প্রশ্ন করলাম তখন বললি হবে তখন তো বলছিলাম ১ ফোটা আওয়াজ ও বের হয় নাই।"
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য শব্দ উচ্চারিত হওয়া আবশ্যক। তবে এই শব্দের 'শোনা' যাওয়া শর্ত নয়, বরং 'উচ্চারণ' হওয়া শর্ত। উচ্চারণের ক্ষেত্রে দুটি স্তর রয়েছে:
- মানসিক চিন্তা বা স্রেফ মনে মনে বলা (حديث النفس): যদি শুধুমাত্র মনে মনে কোনো শব্দ উচ্চারণ করা হয়, জিহ্বা বা ঠোঁট না নাড়ানো হয়, তাহলে কোনো শরয়ী বিধান (যেমন তালাক, কসম) কার্যকর হবে না।
- জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দ গঠন করা (تحريك اللسان والشفتين): যদি জিহ্বা ও ঠোঁট এমনভাবে নাড়ানো হয় যে, শব্দগুলো গঠিত হয়, যদিও তা এত আস্তে যে নিজের কানেও শোনায় না অথবা পরিবেশের কারণে শোনায় না, তবুও তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে। ফকীহগণ বলেন, শর্ত হলো শব্দগুলো এমনভাবে উচ্চারণ করা যে, যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকত (যেমন উচ্চ শব্দ, বধিরতা) তাহলে বক্তা নিজেই শুনতে পেতেন। অর্থাৎ, শব্দের ধ্বনি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নীরবতা তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়ার মাধ্যমে অক্ষরের উচ্চারণ হওয়া জরুরি।
আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনি বলেছেন "মুখ নেড়ে ঠোট নেড়ে বলি" এবং "জিহবা আর ঠোট নড়লেই তালাক হয়ে যায়" এর কথা উল্লেখ করেছেন, তাই এটি শুধুমাত্র মনে মনে বলার পর্যায়ে পড়ে না। যদি সত্যিই ঠোঁট ও জিহ্বা নড়াচড়ার মাধ্যমে "তোমাকে তালাক দিলাম" শব্দগুলো গঠিত হয়ে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয়ে যাবে, যদিও আপনার কানে কোনো শব্দ পৌঁছায়নি।
আগের উত্তরে যদি "হবে" বলা হয়ে থাকে, তাহলে তা এই নীতির ভিত্তিতেই বলা হয়েছিল যে, ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়া দ্বারা শব্দ গঠিত হলেই তালাক হয়, নিজের কানে শোনা শর্ত নয়। "১ ফোটা আওয়াজ ও বের হয় নাই" এর অর্থ যদি এমন হয় যে, কোনো রকম ধ্বনিই তৈরি হয়নি, শুধু ঠোঁট নড়েছে, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু ফিকহের কিতাবসমূহে যে 'ঠোঁট ও জিহ্বা নড়ানো'র কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা অক্ষরের গঠন (যদিও তা অত্যন্ত নিম্ন স্বরে) উদ্দেশ্য।
২. "আয়নায় দেখে বলার কারনে মনে মনে বলাতে কোন চেঞ্জ আসে?"
না, আয়নায় দেখে বলার কারণে মনে মনে বলাতে কোনো পরিবর্তন আসে না। তালাক কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে আয়না একটি অপ্রাসঙ্গিক বস্তু। আপনার ক্রিয়ার ওপর আয়নার কোনো শরয়ী প্রভাব নেই।
তবে "মনে মনে বলা" এবং "আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোঁট নেড়ে বলা" এর মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমনটি উপরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
- মনে মনে বলা (শুধু চিন্তা): এতে তালাক হয় না।
- আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোঁট নেড়ে বলা: যদি জিহ্বা ও ঠোঁট এমনভাবে নড়ানো হয় যে, শব্দগুলো গঠিত হয় (যেমন তালাক, তালাক, তালাক), তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আয়না এখানে কোনো ভূমিকা পালন করে না, এটি কেবল আপনার উচ্চারণের একটি প্রেক্ষাপট মাত্র।
৩. "আর ফতোয়া একটা তো দেখালি যে মুখ আর ঠোট জিহিবা নাড়াই যথেষ্ট"
হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো কথা উচ্চারণ করা (যেমন তালাক, কসম) এর জন্য জিহ্বা ও ঠোঁটকে নাড়ানো শর্ত। যদি কেউ জিহ্বা ও ঠোঁট না নাড়িয়ে শুধু মনে মনে কিছু বলে, তাহলে তা উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হবে না।
রেফারেন্স:
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ফিকহের গ্রন্থ
"রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার" (যা ফাতাওয়া শামী নামেও পরিচিত)-এ উল্লেখ করেছেন:
"ويشترط لصحة التلفظ تحريك اللسان والشفتين بالقدر الذي يسمع به نفسه لو لم يكن هناك مانع"
(রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৬, কিতাবুত তালাক, বাবুল তালাকিস সারিহ)
বঙ্গানুবাদ:
"উচ্চারণ শুদ্ধ হওয়ার জন্য জিহ্বা ও ঠোঁটকে এমনভাবে নাড়ানো শর্ত, যার দ্বারা সে (বক্তা) নিজেই শুনতে পেত, যদি কোনো প্রতিবন্ধক না থাকত।"
এই ফতোয়ার কিতাব অনুযায়ী, নিজের কানে শোনার শর্ত নেই, বরং জিহ্বা ও ঠোঁটকে এমনভাবে নাড়ানো শর্ত যে, শব্দ গঠিত হয় এবং যদি কোনো বাধা না থাকত, তাহলে বক্তা নিজেই তা শুনতে পেত। এটিই মূলত "মুখ আর ঠোট জিহ্বা নাড়াই যথেষ্ট" এই কথার ফিকহী ব্যাখ্যা।
সারসংক্ষেপ:
আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, যদি আপনি "তোমাকে তালাক দিলাম" এই বাক্যটি জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়িয়ে এমনভাবে উচ্চারণ করে থাকেন যে, অক্ষরের গঠন হয়েছে (যদিও তা এত মৃদু স্বরে যে আপনার কানে যায়নি), তাহলে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে গেছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে বলা বা নিজের কানে শুনতে না পাওয়া – কোনোটিই তালাক পতিত হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না, যদি উচ্চারণের শর্ত (ঠোঁট ও জিহ্বার দ্বারা অক্ষরের গঠন) পূরণ হয়ে থাকে।