🏠 Home

iFatwa Q&A (Hanafi Fiqh)

"তোমাকে তালাক দিলাম এই কথাটা যদি আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোট নেড়ে বলি। পরিবেশ ঠান্ডা কোন আওয়াজ এক ফোটাও কানে যায় নাই, ফতোয়ার কিতাবে তো আছে জিহবা আর ঠোট নড়লেই তালাক হয়ে যায়, আমি যে নিজের কানে শুনি নাই তাহলে কি তালাক হবে? একটু আগে শুরুতে একই প্রশ্ন করলাম তখন বললি হবে তখন তো বলছিলাম ১ ফোটা আও য়াজ ও বের হয় নাই।২। আয়নায় দেখে বলার কারনে মনে মনে বলাতে কোন চেঞ্জ আসে? আর ফতোয়া একটা তো দেখালি যে মুখ আর ঠোট জিহিবা নাড়াই যথেষ্ট, আরে ভাই শব্দ গঠিত হইলেই কি হয়ে যাবে নাকি? আমার কানে তো যাওয়া লাগবে? আমি তো এভাবে জোরে মুখ ঠোট নাড়তে পারি আয়নায় দেখলে বুঝা যায় যে মুখ নড়ছে। কিন্তু পরিবেশ তো খুব নীরব তো এক ফোটা আওয়াজ না যাইলে নাকি তালাক হবে না?আমি বধির না আর বাইরে থেকে আওয়াজ ও ছিলো না যে শুনমু না
আপনার প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং এই মাসাআলাটি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা থাকতে পারে। আপনার বিস্তারিত বর্ণনা অনুযায়ী, "আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ নেড়ে ঠোঁট নেড়ে 'তোমাকে তালাক দিলাম' এই কথাটা বলেছেন, কিন্তু পরিবেশ ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও এক ফোটাও আওয়াজ কানে যায়নি।"

হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে তালাক, কসম, কিংবা নামাজে কিরাআত আদায়ের ক্ষেত্রে 'নطق' বা 'উচ্চারণ' এর একটি নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। কেবল ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এর সাথে শব্দ গঠিত হওয়া এবং সেই শব্দ সর্বনিম্ন পর্যায়ে হলেও নিজের কানে শোনা যাওয়ার মতো হওয়া আবশ্যক। যদি এতটুকু শব্দও গঠিত না হয় যা একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি নীরব পরিবেশে নিজে শুনতে পারে, তাহলে তা 'নطق' বা 'উচ্চারণ' হিসেবে গণ্য হয় না।

আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

১. "আমি যে নিজের কানে শুনি নাই তাহলে কি তালাক হবে?"
আপনার এই পরিস্থিতিতে যদি সত্যিই "এক ফোটাও আওয়াজ" বের না হয়ে থাকে, অর্থাৎ এমন কোনো শব্দই গঠিত না হয়ে থাকে যা আপনার নিজের কানে শোনা যেতে পারতো (যদিও আপনার কান বধির নয় এবং পরিবেশ নীরব ছিল), তাহলে তালাক কার্যকর হবে না। কারণ, এটি মনে মনে বলা বা কেবল ঠোঁট নাড়ানোর মতো হবে, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে 'উচ্চারণ' নয়।

আগের প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে আপনার যে বিভ্রান্তি হয়েছে, তার সম্ভাব্য কারণ হলো – আগের উত্তরে হয়তো ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানোর ফলে একটি ক্ষীণ শব্দ হলেও গঠিত হয়েছিল, যা আপনি হয়তো মনোযোগ না দেওয়ার কারণে শুনতে পাননি। কিন্তু আপনার এবারের পরিষ্কার বক্তব্য "এক ফোটাও আওয়াজ বের হয় নাই" এই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিচ্ছে। যদি শব্দ গঠিত না হয়, তাহলে তালাক হবে না।

২. "আয়নায় দেখে বলার কারনে মনে মনে বলাতে কোন চেঞ্জ আসে? আর ফতোয়া একটা তো দেখালি যে মুখ আর ঠোট জিহিবা নাড়াই যথেষ্ট, আরে ভাই শব্দ গঠিত হইলেই কি হয়ে যাবে নাকি? আমার কানে তো যাওয়া লাগবে?"

* আয়নায় দেখে বলার কারণে: আয়নার দিকে তাকিয়ে বলার কারণে তালাকের মাসাআলায় কোনো পরিবর্তন আসে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য মূলত উচ্চারণের ধরণ গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় বা কার দিকে তাকিয়ে বলা হয়েছে তা নয়।
* মনে মনে বলা: মনে মনে কথা বললে (অর্থাৎ, কেবল চিন্তা করলে বা শব্দ গঠন না করে ঠোঁট নাড়ালে) তালাক হয় না। তালাকের জন্য মৌখিক উচ্চারণ (نطق) আবশ্যক।
* শব্দ গঠিত হওয়া ও নিজের কানে শোনা যাওয়া: হানাফি ফিকহের কিতাব অনুযায়ী, কেবল মুখ, ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানোই যথেষ্ট নয়। এর দ্বারা শব্দ গঠিত হওয়া জরুরি। আর সেই শব্দ এতটুকু ক্ষীণ হলেও হতে হবে যা একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি নীরব পরিবেশে নিজে শুনতে পারে। যদি শব্দ একেবারেই গঠিত না হয়, বা গঠিত হলেও নিজের কানে শোনা যাওয়ার মতো না হয় (যখন কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই), তাহলে তা 'নطق' হিসেবে গণ্য হবে না এবং তালাক কার্যকর হবে না।

এক নজরে সারসংক্ষেপ:
যদি আপনি "তোমাকে তালাক দিলাম" এই কথাটি এমনভাবে বলে থাকেন যে, ঠোঁট ও জিহ্বা নড়াচড়া করলেও এক ফোটা শব্দও গঠিত হয়নি যা আপনার নিজের কানে শোনা যেতে পারতো (নীরব পরিবেশ এবং আপনি বধির না হওয়া সত্ত্বেও), তাহলে তালাক পতিত হবে না। কারণ, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি 'উচ্চারণ' হিসেবে গণ্য নয়।

রেফারেন্স:

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-বাহরুর রায়িক্ব (البحر الرائق) এ উল্লেখ করা হয়েছে:
> "وأدنى الجهر أن يسمع غيره وأدنى الإسرار أن يسمع نفسه ويتحقق بسكون الأذن وعدم المانع، فإن لم يسمع نفسه لم يجز صلاته ولا يمضي طلاقه ويمينه."
> (البحر الرائق شرح كنز الدقائق، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة، ج: ١، ص: ٥٣٥، ط: دار المعرفة بيروت)

অনুবাদ:
"সর্বনিম্ন উচ্চস্বরে পড়া হলো, অন্যকে শোনানো। আর সর্বনিম্ন নীরবে পড়া হলো, নিজেকে শোনানো। এবং এটি তখন কার্যকর হয় যখন কান স্থির থাকে এবং কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে। যদি সে নিজেকে না শোনায়, তাহলে তার সালাত জায়েজ হবে না, তার তালাকও কার্যকর হবে না এবং তার কসমও ধর্তব্য হবে না।"

এখানে 'নিজেকে শোনানো' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এমনভাবে শব্দ উচ্চারণ করা যাতে নীরব পরিবেশে স্বাভাবিক শ্রুতিসম্পন্ন ব্যক্তি নিজে তা শুনতে পায়। যদি শব্দ গঠিত না হয়ে কেবল ঠোঁট ও জিহ্বা নড়াচড়া করা হয়, তবে তা নিজেকে শোনানোর মতো হয় না।

দ্রষ্টব্য: এটি একটি ফিকহি বিশ্লেষণ। তালাকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য কোনো মুফতির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলা অধিক নিরাপদ ও কাম্য।