রিজিক তো নির্ধারিত বিষয় তবে হালাল ইনকাম করার জন্য চেষ্টা করতে হবে । আবার স্ত্রী সন্তানের ভরনপোষণ দেওয়া ওয়াজিব। হালাল ভাবে ইনকাম করতে গেলে অনেক সময় জামাতে নামাজ মিস হতেও পারে । শত বেচে থাকার চেষ্টা করার পরেও মাকরুহ এবং গোনাহ হয়েও যেতে পারে যেহেতু মানুষ সয়তান এবং নফসের কারনে গোনাহ করে ফেলে সম্পদ এবং সন্তান এগুলো পরকালীন পাথেয় সংগ্রহ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে?
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নগুলো ইসলামের মৌলিক কিছু বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত, যা একজন মুসলিমের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ifatwa.info এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী হানাফি মাযহাবের সংক্ষিপ্ত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. রিজিক নির্ধারিত ও হালাল উপার্জনের চেষ্টা:
ইসলামের মৌলিক আকীদা হলো, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সৃষ্টির রিজিক নির্ধারিত করে রেখেছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা ছেড়ে বসে থাকবে। বরং, রিজিক অন্বেষণ করা এবং তা হালাল পন্থায় উপার্জন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ওয়াজিব (ফরজ)। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো।" (সূরা আল-জুমুআ: ১০)
এবং তিনি আরও বলেন:
"মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে চেষ্টা করে।" (সূরা আন-নাজম: ৩৯)
সুতরাং, রিজিক নির্ধারিত হলেও হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করা ইবাদতের অংশ এবং এটি আল্লাহর নির্দেশ।
২. স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ:
স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ (নফাকা) দেওয়া স্বামীর বা পিতার উপর ওয়াজিব (ফরজ)। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা আবশ্যক।
৩. হালাল উপার্জনের চেষ্টা ও জামাতে নামাজ:
হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা যেমন ওয়াজিব, তেমনি সালাত আদায় করা (বিশেষত পুরুষদের জন্য জামাতের সাথে) আল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, পুরুষদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা 'সুন্নাতে মুয়াক্কাদা' (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত) এবং কোনো ওজর ছাড়া তা পরিত্যাগ করা মাকরূহ তাহরীমী ও গুনাহের কাজ।
তবে, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি হয় যে, হালাল উপার্জন করতে গিয়ে (যেমন - ডাক্তার, জরুরি সেবা প্রদানকারী, শ্রমিকের কাজ ইত্যাদি) জামাত ছুটে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন কাজের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে ফায়সালা ভিন্ন হতে পারে।
- যদি কাজ এমন হয় যে, তা ছেড়ে দিলে বড় ধরনের ক্ষতি (যেমন: জীবনহানি, সম্পদহানি, চুক্তি ভঙ্গ) হবে, তবে এমতাবস্থায় জামাত ছুটে গেলেও ব্যক্তি একা নামাজ আদায় করে নিবে। তবে সালাত ওয়াক্তের মধ্যেই আদায় করা অপরিহার্য।
- যদি কাজটি এমন হয় যা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে জামাতে অংশ নেওয়া সম্ভব এবং এতে বড় কোনো ক্ষতি না হয়, তবে জামাতে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
- সাধারণভাবে, একজন মুসলিমের উচিত এমন কর্মসংস্থান বেছে নেওয়া যা তাকে তার ধর্মীয় কর্তব্য পালনে বাধা না দেয়। কাজের সময় সালাতের বিরতি নেওয়া বা কাজের স্থানে সালাতের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি বিষয়ে নিয়োগকর্তার সাথে আলোচনা করা উচিত।
মনে রাখবেন, জামাত ছুটে গেলেও ওয়াক্তের মধ্যে সালাত আদায় করা কোনোভাবেই ছাড়া যাবে না।
৪. শয়তান ও নফসের কারণে মাকরূহ ও গুনাহ:
মানুষ হিসেবে আমরা দুর্বল এবং শয়তান ও নফসের কুমন্ত্রণা আমাদের গোমরাহ করতে পারে। হালাল উপার্জনের চেষ্টাতেও কখনো কখনো অসাবধানতাবশত মাকরূহ বা ছোটখাটো গুনাহ হয়ে যেতে পারে। এর জন্য হতাশ না হয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি:
- তাকওয়া: সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
- ইস্তেগফার: কোনো ভুল বা গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তেগফার করা। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল।
- নিয়ত: আপনার মূল নিয়ত যদি হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, তবে আল্লাহ আপনার চেষ্টা ও উদ্দেশ্যকে দেখবেন।
৫. সম্পদ ও সন্তান পরকালীন পাথেয় সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা?
কুরআন ও হাদীসে সম্পদ ও সন্তানকে 'দুনিয়ার সৌন্দর্য' এবং 'পরীক্ষার বিষয়' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার বস্তু।" (সূরা আত-তাগাবুন: ১৫)
এর অর্থ হলো, এগুলো যদি আল্লাহ ও আখেরাত থেকে মানুষকে গাফেল করে দেয়, তাহলে তা প্রতিবন্ধক। কিন্তু যদি এগুলিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে এগুলি পরকালের পাথেয় সংগ্রহের মাধ্যম হতে পারে:
- সম্পদ: হালাল উপার্জিত সম্পদ যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হয় (সাদাকা, যাকাত, গরিবের সাহায্য, দ্বীনি কাজে), তবে তা আখিরাতের সওয়াব।
- সন্তান: সন্তানকে যদি ইসলামী শিক্ষা ও তরবিয়ত দিয়ে বড় করা হয়, তবে সে নেক সন্তান পিতামাতার জন্য সদকায়ে জারিয়া হতে পারে।
সুতরাং, সম্পদ ও সন্তান নিজে প্রতিবন্ধক নয়, বরং এগুলোর প্রতি আমাদের আসক্তি এবং ব্যবহারের পদ্ধতিই নির্ধারণ করে যে, এগুলো আমাদের জন্য সহায়ক হবে নাকি প্রতিবন্ধক।
সারসংক্ষেপ:
রিজিক নির্ধারিত হলেও হালাল উপার্জনের চেষ্টা ওয়াজিব এবং স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ দেওয়াও ওয়াজিব। হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে জামাত ছুটে গেলেও সালাত ওয়াক্তের মধ্যে আদায় করা অপরিহার্য। একজন মুসলিমের উচিত এমন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যা তাকে সালাত আদায়ে বাধা না দেয়। শয়তান ও নফসের কারণে ভুল হলে তওবা-ইস্তেগফার করতে হবে। সম্পদ ও সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা; এগুলোকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যবহার করতে পারলে তা পরকালীন পাথেয় সংগ্রহে সহায়ক হবে, অন্যথায় প্রতিবন্ধক হতে পারে।
১টি রেফারেন্স:
আবু বকর আল-কাসানী, বাদাইউস সানায়ে’ ফি তারতিবিশ শারায়ে’ (Kitab al-Kasb wal-Ma'ash, Kitab as-Salah, Kitab an-Nafaqah)। এই গ্রন্থে হানাফি মাযহাবের ফিকহি বিধানসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে রিজিক অন্বেষণ, হালাল উপার্জন, জামাতের হুকুম এবং পারিবারিক দায়িত্বের বিভিন্ন দিক উল্লেখ আছে।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।