আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন কাজের সাথে জড়িত, যা ইসলামে হারাম ও গুরুতর গুনাহ হিসেবে গণ্য। আমরা জানি, মানুষ ভুল করতে পারে; গুনাহ হয়ে গেলে তওবার দরজা খোলা থাকে এবং আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল। কিন্তু সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন (খুনি, পতিতা, সুদখোর, নেশাগ্রস্থ), যারা বড় গুনাহের সাথে জড়িত অবস্থায় জীবনযাপন করেন এবং সেই কাজ থেকে ফিরে আসেন না। তারা নামায-রোযা বা অন্যান্য আমলের সাথেও যুক্ত থাকেন না। যদি তারা এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের অন্তরে শুধু এই অনুভূতি থাকে যে তারা ভুল করছে, তারা পাপের মধ্যে আছে—কিন্তু তওবা করার বা আমল করার সুযোগ আর পায় না। এ অবস্থায়, শুধুমাত্র এই পাপবোধ ও নিজের ভুল স্বীকারের অনুভূতি থাকলে, ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ কি তাদের ক্ষমা করে জান্নাত দান করতে পারেন?
কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা জানালে উপকৃত হবো।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সংক্ষেপে জবাব:
ইসলামে বড় গুনাহেও আল্লাহর কাছে তওবার পথ খোলা। হানাফী মতানুসারে সত্যিকারের (সৎ) তওবার চারটি শর্ত আছে — অন্তরে পশ্চাত্তাপ (নাদাম), ভগ্ন-ভঙ্গ করে অপরাধ ত্যাগ করা (ফৌধ), ভবিষ্যতে ফের সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প ও, যদি অন্যের মাল-মক্কেল বা অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত থাকে, তা ফেরত দেওয়া বা মুকদ্দমা মিটানো। একজন ব্যক্তি যদি মৃত্যুর আগেই এই শর্তসমূহের সৎ মনোভাব ধারণ করে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। আল্লাহর মর্জি ছাড়া নিশ্চিত বলা সম্ভব না — তবে মুসলিমের জন্য আশা রাখাই উচিত, ভয়ও রাখতে হবে। যারা জীবদ্দশায় গুণাহের মধ্যে ছিলেন ও কার্যত তওবা করেননি, শুধু অন্তরের পস্ন্নতাপ থাকলেই তা সর্বদা গ্রহণযোগ্য তওবা—এমন নয়; আন্তরিকতা ও বাস্তব পরিবর্তন অনিবার্য। শেষ সিদ্ধান্ত মহান আল্লাহরই।
হাদিস সূত্র (একটি উদ্ধৃতি):
"كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ"
(অর্থ: প্রত্যেক বান্দা ভুল করে; আর ভুলকৃতদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো যারা তওবা করে)। — (Sunan Ibn Mājah)
হানাফী ফিকহের কয়েকটি প্রয়োগি দিক (সংক্ষিপ্ত):
- যদি গুনাহে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হয় (যেমন ঋণ, হত্যা, অন্যের মাল), সেসকল অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে; তা না করা পর্যন্ত মুকাবিলা (দণ্ড/ঘটনার পরিণতি) হতে পারে। মৃতব্যক্তি নিজে যদি তা করতে সক্ষম না হয়, তাদের উত্তরাধিকারীরা দায়বদ্ধ হয় (যথাযথ ক্ষেত্রে) অথবা যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের মাফ চাইতে হবে।
- মৃত্যু-ক্ষণে যদি আন্তরিক অনুশোচনা ও আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা থাকে — এমন মনোভাবকে আল্লাহ গ্রহণ করতে পারেন; এই ব্যাপারে সক্ষম ও দয়ালু আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।
- তবে কাউকে নিশ্চিতভাবে জানিয়ে বলা যায় না যে সে জান্নাতে যাবে—এটা আল্লাহর সিদ্ধান্ত; আমাদের কাজ হলো অন্যদের তাওবার উদ্দেশ্যে ডাকার, দোয়া করা ও সদকাহ পাঠ করা (যদি উপকারী মনে করা হয়)।
উপসংহার:
আপনার বর্ণিত অবস্থার মানুষদের জন্য শেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহই জানেন; তবে ইসলামের দৃষ্টিতে পাপকর্ম এবং ভুলের স্বীকার হওয়ার অনুভূতি যদি আন্তরিক পশ্চাত্তাপের সূচক হয় এবং মৃত্যুর আগেই সে আন্তরিকতা—তাহলে আল্লাহ ক্ষমা করতেই পারেন। একইসঙ্গে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না; সুতরাং আল্লাহর দয়া ও বিচার—উভয়েরই যজ্ঞ স্মরণ রেখে আশা ও ভয়ের মধ্যে থাকা উচিত। আল্লাহ আমাদের সকলকে সৎ তওবা করার তাওফিক দান করুন।