রিজিক তো নির্ধারিত বিষয় তবে হালাল ইনকাম করার জন্য চেষ্টা করতে হবে । আবার স্ত্রী সন্তানের ভরনপোষণ দেওয়া ওয়াজিব। হালাল ভাবে গাড়ি ড্রাইভিং করে ইনকাম করতে গেলে অনেক সময় জামাতে নামাজ মিস হতেও পারে । শত বেচে থাকার চেষ্টা করার পরেও মাকরুহ এবং গোনাহ হয়েও যেতে পারে যেহেতু মানুষ সয়তান এবং নফসের কারনে গোনাহ করে ফেলে সম্পদ এবং সন্তান এগুলো পরকালীন পাথেয় সংগ্রহ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে?
আপনার প্রশ্নটি বেশ গভীর এবং বাস্তবসম্মত, যা হালাল উপার্জন, পারিবারিক দায়িত্ব, নামাজ এবং পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ইফাতওয়া.ইনফো (ifatwa.info) এবং হানাফি ফিকহের আলোকে এর একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১.
রিজিক ও হালাল উপার্জনের চেষ্টা:
এটি সঠিক যে রিজিক আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত। তবে রিজিকের জন্য হালাল পন্থায় চেষ্টা করা ফরয বা ওয়াজিব। এটি মুমিনের ইবাদতের অংশ। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: "যখন নামাজ সমাপ্ত হয় তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধান করো।" (সূরা জুমু'আ: ১০)
২.
স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ:
স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ দেওয়া একজন পুরুষ অভিভাবকের উপর ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)। এটি একটি মহৎ কাজ এবং এর দ্বারা সওয়াব অর্জিত হয়, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়।
৩.
জামাতে নামাজ ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য:
- ফরজ নামাজ সময়মতো আদায় করা: প্রতিটি মুসলমানের উপর ব্যক্তিগতভাবে ফরজ নামাজ তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করা ফরয। এটি কোনো অবস্থায়ই বাদ দেওয়া যাবে না।
- জামাতে নামাজ: পুরুষদের জন্য জামাতে নামাজ আদায় করা হানাফি মাযহাবে 'ওয়াজিব' বা 'সুন্নাতে মুয়াক্কাদা' (যা ওয়াজিবের কাছাকাছি)। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিনা ওজরে জামাত ত্যাগ করা মাকরুহ তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি)।
- ওজর (বৈধ কারণ): তবে, যদি কোনো ব্যক্তি এমন পেশায় নিযুক্ত থাকেন যেখানে তার হালাল উপার্জন (যা তার ও তার পরিবারের জন্য ওয়াজিব) অর্জনের জন্য জামাতে হাজির হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, অথবা এতে তার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়, তবে এমন ক্ষেত্রে জামাত ছুটে গেলে তিনি গুনাহগার হবেন না। শর্ত হলো, তিনি ব্যক্তিগতভাবে হলেও নামাজ অবশ্যই তার ওয়াজিব সময়ে আদায় করবেন। ড্রাইভিং পেশা এমন একটি ওজর হতে পারে, বিশেষ করে যখন বিরতি নেওয়ার সুযোগ না থাকে।
- সর্বোচ্চ চেষ্টা: এরপরও মুমিনের উচিত হলো, সাধ্যমতো জামাতে নামাজ আদায় করার চেষ্টা করা। সম্ভব হলে নামাজের বিরতি নেওয়া, আগে বা পরে কাজকে সমন্বয় করা, অথবা এমন রুজি বেছে নেওয়া যেখানে জামাত আদায়ে সমস্যা কম হয়।
৪. মাকরুহ/গুনাহ ও শয়তানের প্ররোচনা:
মানুষ হিসেবে আমরা শয়তান ও নফসের প্ররোচনার শিকার হতে পারি। যদি সাধ্যমতো চেষ্টা করার পরেও জামাত ছুটে যায় এবং এর জন্য মনে কষ্ট থাকে, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের চেষ্টা ও আন্তরিকতা দেখেন। নামাজ যদি সময়মতো ব্যক্তিগতভাবে আদায় করা হয় এবং জীবিকা হালাল হয়, তবে আশা করা যায় যে আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
৫. সম্পদ ও সন্তান পরকালীন পাথেয়:
সম্পদ ও সন্তান inherently (স্বাভাবিকভাবে) পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের প্রতিবন্ধকতা নয়। বরং এগুলো আল্লাহর দেওয়া আমানত এবং পরীক্ষার মাধ্যম।
- যদি প্রতিবন্ধকতা হয়: যদি সম্পদ হারাম পথে উপার্জিত হয়, অথবা সন্তান ও সম্পদ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়, হালাল-হারামের পরোয়া না করায়, তবে তা পরকালের জন্য প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: "তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার বিষয়।" (সূরা তাগাবুন: ১৫)
- যদি পাথেয় হয়: কিন্তু যদি সম্পদ হালাল পথে উপার্জন করে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে খরচ করা হয় (যেমন যাকাত, সাদাকা, পরিবারকে হালাল খাওয়ানো) এবং সন্তানদের নেক ও মুত্তাকী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তবে এই সম্পদ ও সন্তানই পরকালীন সাফল্যের মাধ্যম ও সওয়াবের কারণ হবে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: রিজিক নির্ধারিত হলেও হালাল উপার্জনের চেষ্টা ওয়াজিব। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণও ওয়াজিব। হালাল জীবিকার জন্য গাড়ি চালালে যদি জামাতে নামাজ মাঝে মাঝে ছুটে যায়, তবে তা একটি বৈধ ওজর হিসেবে গণ্য হতে পারে, যদি ব্যক্তি যথাসাধ্য চেষ্টা করে এবং ব্যক্তিগতভাবে সময়মতো নামাজ আদায় করে। এক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ মাকরুহ বা গুনাহ হবে না। সম্পদ ও সন্তান আল্লাহর পথে পরিচালিত হলে পরকালীন পাথেয় হবে, অন্যথায় প্রতিবন্ধক হতে পারে।
১টি রেফারেন্স:
ইমাম আলাউদ্দিন আল-হাসকাফী (র.) তার বিখ্যাত কিতাব 'দুররুল মুখতার'-এ জামাত ত্যাগের বৈধ কারণসমূহ উল্লেখ করেছেন। এর ব্যাখ্যায় ইবন আবিদিন (র.) 'রাদ্দুল মুহতার' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, জীবিকা অর্জনের এমন কাজ, যা ছেড়ে দিলে নিজের বা পরিবারের প্রয়োজনীয় ক্ষতি হয়, তা জামাত ত্যাগের একটি বৈধ ওজর। তবে, ফরজ নামাজ সময়মতো একাকী আদায় করতে হবে।
সূত্র:
ইবন আবিদিন, মুহাম্মদ আমিন। *রাদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার* (সাধারণত 'ফাতাওয়া শামী' নামে পরিচিত)। দারুল ফিকর, বৈরুত। [জামাত ত্যাগের ওজর সংক্রান্ত অধ্যায়ে, বিশেষত জুমা ও সাধারণ জামাতের মাসআলায় এটি উল্লেখ আছে।]
(উদাহরণস্বরূপ, "কিতাবুস সালাত" অধ্যায়ে "বাবুল জুমা" অথবা "বাবুল ইমামাত" এর আলোচনায় জামাত ত্যাগের ওজর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।)