🏠 Home

iFatwa Q&A (Hanafi Fiqh)

আমাদের বাসায় ৭–৮ বছরের একটি ছোট মেয়েকে হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে রাখা হয়েছে। মেয়েটি এতিম এবং বয়সও কম। তাদের পরিবার খুবই দরিদ্র। তার মা মানুষের বাসায় কাজ করতেন এবং সিজারিয়ান অপারেশনের সময় মারা যান। এরপর মেয়েটি তার দাদির কাছে থাকত। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তার দাদি তাকে ঠিকমতো খাওয়াতে পারতেন না। এমনকি তেল কেনার টাকাও না থাকায় তার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে তাকে কলসিতে পানি ভরে আনা, উঠান ঝাড়ু দেওয়া ইত্যাদি বেশ কিছু ভারী কাজও করতে হতো। অন্যদিকে আমার এক বছর বয়সী একটি বাচ্চা আছে। বাচ্চার পাশে কেউ থাকার জন্য আমি একজন হেল্পিং হ্যান্ড খুঁজছিলাম, যাতে আমি নামাজ পড়া, খাওয়া বা ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় মেয়েটি বাচ্চার সঙ্গে থাকে। অন্য সময় সে বাচ্চার সঙ্গে খেলবে এবং ছোটখাটো কিছু কাজ করবে—যেমন কাপড় ভাঁজ করা, ফার্নিচার মুছা, ছাদে কাপড় শুকাতে দেওয়া, টেবিল পরিষ্কার করা, বিছানা গুছানো ইত্যাদি। আমরা তাকে দিয়ে কোনো ভারী কাজ করাই না। আলহামদুলিল্লাহ, এখানে সে খুব ভালো খাবার পায়। আমরা যা খাই, তাকেও তাই খেতে দিই। পাশাপাশি তাকে চিপস, চকলেট, আইসক্রিমও দিই। তার জন্য বেশ কিছু নতুন জামা ও নতুন জুতা কিনে দেওয়া হয়েছে। আমি তাকে খুব আদর করতাম। কিন্তু কিছুদিন ধরে দেখছি, সে আমার এক বছরের বাচ্চাটিকে জোরে ধাক্কা দেয়, মাথায় আঘাত করে, বাচ্চা কাঁদলে লাথি দেয় বা হাত ধরে জোরে টানে। আমি অনেকবার বোঝানোর পরও এসব আচরণ দেখছি। তাই এখন আর আগের মতো তাকে আদর করতে ইচ্ছে ক না। আগে যেমন আদর করে কথা বলতাম, এখন আর তেমন বলি না, কারণ মনে হচ্ছে আদরেও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এখন আমি তাকে সব সময় আমার বাচ্চার জিনিস দিয়ে খেলতে দিই না (মাঝে মাঝে দিই)। বাচ্চা থেকে কিছুটা দূরে রাখি, কারণ ভরসা করতে পারছি না। তবে সে তার দাদির কাছে ফিরে যেতে চায় না। কারণ সেখানে তার অনেক কষ্ট হয়, ভালো খাবারও পায় না এবং অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু আমিও তাকে আর আগের মতো আপন মনে করে আদর করি না। এখন সে শুধু বাসার ছোটখাটো হালকা কাজগুলোই করে। এভাবে তাকে আমাদের বাসায় রাখা কি অন্যায় হবে? সে নিজেও বলে যে এখানে সে অনেক ভালো আছে এবং দাদির কাছে যেতে চায় না। আমি কী ওর হক্ক নষ্ট করছি ?
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — হানাফী ফিকহ অনুসারে — এই মেয়েটিকে বাসায় রাখা মোটেই হারাম বা আপাতত অন্যায় হবে না, بشرط (শর্ত) নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বজায় থাকলে:

1) অভিভাবকের কনসেন্টঃ মেয়েটিকে স্থায়ীভাবে বা শ্রম করানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে থাকলে তার আইনগত অভিভাবক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির সম্মতি থাকা উত্তম। যদি দাদি বা অন্য কোন বৈধ অভিভাবক তাকে আপনার কাছে বিশ্বাস করে দিয়ে থাকেন এবং ভরণপোষণ আপনার হাতে থাকে, তাহলে এটা হালাল। অভিভাবকের অনুমতি না থাকলে তাকে যামিন না নিয়ে রাখা সমস্যা তৈরি করতে পারে।

2) কাজের ধরনের পরিধি ও বয়সের উপযোগিতাঃ আপনি যে কাজগুলো বর্ণনা করেছেন (হালকা গৃহস্থালির কাজ, শিশুর পাশে থাকা, পোশাক ভাঁজ করা ইত্যাদি) — যদি এগুলো তার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং তাকে অতিরিক্ত শ্রম, খারাপ আচরণ বা অমানবিক পরিশ্রমে নিযুক্ত করা না হয় — তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। হানাফীর মতে বাচ্চা বা অনাথকে ভারি কাজ করানো বা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া অনুচিত।

3) ভরণ-পোষণ ও অধিকারঃ তাকে আপনাদের পরিবারের খাবার, পোশাক, বিশ্রাম ইত্যাদি ঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে—এটা তার আসল অধিকার; এছাড়া যদি সে কাজের বিনিময়ে মজুদ বা মজুরি পাওয়ার যোগ্য হয় ও আপনারা তাকে তেমন কিছু দেন না, তাহলে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়াও নৈতিক ও ফিকহানুগ অনুরোধ। শিক্ষা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা উত্তম।

4) শিশু নিরাপত্তা ও সীমা নিরূপণঃ আপনার এক বছরের শিশুর নিরাপত্তা সর্বোচ্চ প্রাধান্য রাখবেন। যদি সে বারবার আপনার শিশুকে আঘাত করে, তাহলে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখা বা শিশুর কাছে সুপারভিশন ছাড়া অনুমতি না দেয়া উচিত। এটা অন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত নয়—কারণ কোনো কর্তার অধিকারই অপরের জীবন/স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না। আশে-পাশে শেখানো, সদয়ভাবে সতর্ক করা ও শৃঙ্খলিতভাবে ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করুন; যদি গ্রহণ না করে বা বিপদ চলতেই থাকে, তাহলে তাকে শিশুর কাছ থেকে দূরে রাখা বা বিশেষ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া সমীচীন।

5) মানসিক আচরণ ও সদাশয়তা বজায় রাখাঃ আপনি আগে তাকে আদর করতেন এবং এখন কম আদর করেন—এটা অভিযোগ নয় যতক্ষণ আপনি তাকে খাওয়া-দাওয়া, পোশাক ও সম্মান দিয়ে থাকেন। কিন্তু সম্পূর্ণ দূরত্ব বা ঠাণ্ডা আচরণ করলে তা অনাথের প্রতি খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে; চেষ্টা করুন দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ বজায় রাখতে।

6) যদি মেয়েটি নিজে দাদীর কাছে ফিরতে চায় না এবং আপনারা তাকে ভাল রাখেন, তবে মূল বিষয় হলো অভিভাবকের সম্মতি ও তার অধিকার পূরণ। অভিভাবক যদি চান তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন; অন্যথায় আপনি দায়িত্বশীলভাবে রাখলে তা গ্রহণযোগ্য। প্রয়োজনে স্থানীয় ওকিল/বিচারিক কর্তৃপক্ষ বা সমাজকল্যাণ বিভাগের কাছে আইনগত দিকটা নিশ্চিত করে রাখতে পারেন।

সংক্ষেপে: আপনি যদি—অভিভাবকের সম্মতি থেকে রেখেছেন; তাকে ভারী বা অনৈতিক কাজ করান না; খাবার, পোশাক, বিশ্রাম, সম্মান ও উপযুক্ত পরিচর্যা দেন; এবং আপনার শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণ/নিয়ম মেনে চলেন—তবে তাকে আপনার ঘরে রাখা অন্যায় নয়। আবার, যদিহেতু সে আপনার শিশুকে আঘাত করে, আপনি তাকে শিশুর কাছ থেকে আলাদা রাখতে পারেন এবং সতর্কভাবে আচরণ শিক্ষিত করার ব্যবস্থা নিতে পারেন; এটাই কর্তব্য।

রেফারেন্স (একটি হাদিস):
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত—“أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا” — (আমি ও অনাথের কফেল (জিম্মাদার) জান্নাতে এমনই নিকটতায় থাকবো) — সাহিহ বুখারী।