কালকে ifatwa তে একজন এর প্রশ্ন দেখলাম লোকটা বললো জিহবা কামড়াতে কামড়াতে তালাক বলছে ঠোট জিহবা নেড়ে শব্দ কতে নাই। বিষয় টা অদ্ভুত মনে হলো তাই তারাবী পড়ার সময় আমিও ওটা ভেবে তার মত জিহবা কামড়াইয়া তা-আ আ লা ক অ (( জিহবা চাবাচ্ছি)। পরে মনে হলো হায় এভাবে তো করা যাবে না। পরে নিজেকে বুঝ দেওয়ার জন্য আবারো বললাম তা-লা-ক অ যে আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে তো বলি নাই। শুধু সে কেমনে এটা করলো দেখছি। ১. এতে কি তালাক হিয়ে গেলো? ২। মনে মনে ঠোট + জিহবা নেড়ে সব মাজহান এই কি তালাক হ হয় না শব্দ একটু হলেও শুনা লাগবে? হাদিসে যেটা আছে সেটা তো ওয়াসওয়াসা মাফ করে দিছে কিন্তু জবান নাড়া তো বলাই কেউ কেউ বলে. তাই দুশ্চিন্তা সরে না মাথা থেকে তারা কি ভুল বললো
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়া হলো। তালাকের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে আপনার উত্থাপিত বিষয়গুলো হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. এতে কি তালাক হয়ে গেলো?
না, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এই অবস্থায় তালাক সংঘটিত হয়নি। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:
- শব্দ উচ্চারণ না হওয়া: তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকসূচক বাক্যটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা জরুরি, যাতে অন্তত নিজের কানে শোনা যায়। জিহ্বা কামড়ে ধরে শব্দ উচ্চারণ না করলে বা আওয়াজ একেবারেই না হলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
- ইচ্ছা বা নিয়তের অনুপস্থিতি: তালাকের মতো একটি গুরুতর বিষয় কেবল ইচ্ছাকৃত উচ্চারণেই কার্যকর হয়। আপনি এখানে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাক্যটি বলেননি, বরং অন্য একজন কীভাবে কাজটি করেছিল তা পরীক্ষা করার জন্য বা বোঝার জন্য করেছেন। তালাকের নিয়ত না থাকায় এবং বাস্তব তালাক প্রদানের উদ্দেশ্যে এটি না বলায় তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
- ওয়াসওয়াসা থেকে সুরক্ষা: যদিও আপনি এটি বাস্তবে করেছিলেন, তবুও এর পেছনে কোনো তালাকের উদ্দেশ্য ছিল না। মানসিক চিন্তা-ভাবনা, সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) দ্বারা তালাক পতিত হয় না। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আমার উম্মতের মনে যা উদিত হয়, আল্লাহ তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজ করে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) আপনার ক্ষেত্রে বলাও হয়নি (আওয়াজ হয়নি) এবং উদ্দেশ্যও তালাক দেওয়া ছিল না।
২. মনে মনে ঠোট + জিহবা নেড়ে সব মাজহান এই কি তালাক হ হয় না শব্দ একটু হলেও শুনা লাগবে?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তালাক বা অন্য কোনো কথার ক্ষেত্রে যেটুকু ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়াচাড়া করলে তা উচ্চারণ হিসেবে গণ্য হয়, তার সর্বনিম্ন সীমা হলো, ব্যক্তি নিজে যদি তা শুনতে পায় (যদিও আশেপাশে কোলাহল বা অন্য কোনো কারণে অন্য কেউ না শুনে)। অর্থাৎ, ফিসফিস করে হলেও এমনভাবে বলতে হবে যেন শব্দ তৈরি হয় এবং নিজের কানে তা প্রবেশ করে।
- মনে মনে ভাবা বা কল্পনা করা: কেবল মনে মনে ভাবলে, কল্পনা করলে, বা ঠোঁট-জিহ্বা নাড়িয়ে শব্দ তৈরি না করে কোনো কথা বললে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে "বলা" হিসেবে গণ্য হয় না, ফলে এর দ্বারা তালাক পতিত হয় না।
- শব্দ শোনার শর্ত: নামাজে ক্বিরাত বা কোরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রেও হানাফি ফিকহের এই নিয়ম প্রযোজ্য যে, নামাজী এমনভাবে শব্দ উচ্চারণ করবে যেন সে নিজে তা শুনতে পায়। এই মূলনীতি তালাকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন আপনি জিহ্বা কামড়ে ধরেছিলেন, তখন শব্দ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, ফলে এটি বলার সর্বনিম্ন শর্তও পূরণ করেনি।
আপনার দুশ্চিন্তা নিরসন এবং "জবান নাড়া তো বলাই কেউ কেউ বলে" এর ব্যাখ্যা:
যারা বলেন যে, শুধু ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ালে তা বলা হয়ে যায়, তাদের উদ্দেশ্য হলো এমনভাবে নাড়ানো যার ফলে *অন্তত ফিসফিস করে হলেও শব্দ তৈরি হয় এবং নিজ কানে তা শোনা যায়*। অর্থাৎ, তারা মনে মনে কেবল ঠোঁট নাড়ানোকে "বলা" বলছেন না, বরং এমনভাবে নাড়ানোকে বলছেন যার ফলে এক ধরনের আওয়াজ সৃষ্টি হয় (যদিও তা খুব ক্ষীণ হতে পারে) এবং যা নিজ কানে অনুভব করা যায়।
কিন্তু যদি এমন হয় যে, জিহ্বা কামড়ে রাখার কারণে বা অন্য কোনো কারণে কোনো ধরনের আওয়াজই তৈরি হলো না, এমনকি ফিসফিস করার মতো ক্ষীণ আওয়াজও না, তাহলে তা বলা হিসেবে গণ্য হবে না এবং এর দ্বারা তালাক পতিত হবে না। আপনার ক্ষেত্রে জিহ্বা কামড়ে রাখার কারণে শব্দ তৈরির সম্ভাবনা ছিল না এবং তালাকের উদ্দেশ্যও ছিল না।
সারসংক্ষেপ:
আপনার বর্ণিত ঘটনায় তালাক সংঘটিত হয়নি। কারণ, তালাকের জন্য বাক্যটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা জরুরি, যাতে অন্তত নিজের কানে শোনা যায় এবং তালাক দেওয়ার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হয়। আপনার ক্ষেত্রে এর কোনোটিই ছিল না।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৯ (কিতাবুত তালাক): "তালাক উচ্চারণের জন্য শব্দ প্রকাশ করা শর্ত, যাতে নিজ কান শুনতে পায়।" (অনুবাদ)
- রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়ায়ে শামী), ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৯ (বাবুল ইয়াঈমিন, আদাবুল মুফতি): "আল-ক্বিরাআতু ফি আস-সালাত লা ইয়াকুনু ইল্লা বিতাহরিকি আস-শাফাতাইন ওয়াল লিসান মা'আ তাসমী'ই আন-নাফসি।" (অর্থাৎ, নামাজের ক্বিরাত তখনই হয় যখন ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ানো হয় এবং নিজে তা শুনতে পায়)। তালাকের ক্ষেত্রেও এই মূলনীতি প্রযোজ্য।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী), ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫২ (কিতাবুত তালাক, বাবুল আওয়াল ফিল তালাক আস-সারিহ): "আল-তালাকু লা ইয়াকুনু ইল্লা বিল-লফজি আস-সারিহ আও আল-কিনায়াতি মা'আ আন্-নিয়্যা।" (অর্থাৎ, তালাক সুস্পষ্ট শব্দ অথবা নিয়তের সাথে ক্বিনায়ী শব্দ ছাড়া হয় না)।
ভবিষ্যতে এমন কোনো পরীক্ষা বা অনুকরণ করা থেকে বিরত থাকুন। এতে অনর্থক মানসিক অস্থিরতা বা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আল্লাহই ভালো জানেন।