আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমি একজন বিবাহিত মুসলিম নারী, বর্তমানে গর্ভবতী। আমার পূর্বে একটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। আসন্ন ডেলিভারি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহগত বিষয়ে আপনার নিকট ফাতওয়া/পরামর্শ কামনা করছি।
১️⃣ বর্তমান অবস্থা
আমি বর্তমানে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আছি। চিকিৎসক আমাকে নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা (যেমন—এনোমালি স্ক্যান) ও হাসপাতালভিত্তিক নিরাপদ ডেলিভারির পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দেশের বাস্তবতায় প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ/দায়ী প্রায় অনুপস্থিত। বাসায় ডেলিভারি সাধারণত অপ্রাতিষ্ঠানিক নার্স বা দায়ী দ্বারা করানো হয়, যারা জরুরি জটিলতা (রক্তক্ষরণ, প্রসব আটকে যাওয়া, শিশুর শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি) মোকাবেলায় সক্ষম নন।
২️⃣ স্বামীর অবস্থান
আমার স্বামী মনে করেন—
বাসায় নার্স/দায়ী দিয়ে ডেলিভারি করানোই যথেষ্ট।
হাসপাতালে ডেলিভারি করা আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী এবং প্রয়োজন নেই।
ঝুঁকি নিয়ে বাসায় সন্তান জন্ম দেওয়াই তাওয়াক্কুলের প্রকাশ যেমনটি আগের যুগে মা খালারা করে এসেছেন।
তাছাড়া, যেসকল স্ত্রী রা স্বামীর এমন সিদ্ধান্তে বিনা বাক্যে সম্মতি দিয়ে জীবন ঝুঁকি আছে কি নেই এত কিছু না ভেবে ডেলিভারি করান, তারাই প্রকৃত দ্বীনদার।
তিনি এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ বা আমার সাথে আলোচনা করতে রাজি নন; এমনকি চিকিৎসক নির্ধারিত কিছু পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেছেন, যেমন ২২ সপ্তাহে গর্ভফুল নিচে থাকার কারনে ১ টি 4ডি আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান যা গর্ভফুলের অবস্থা জানতে, বাচ্চার জরায়ুতে অবস্থান জানতে সাহায্য করে।
৩️⃣ সম্ভাব্য মেডিক্যাল ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে বাসায় অপ্রশিক্ষিত ব্যবস্থায় ডেলিভারির ক্ষেত্রে—
প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরন (PPH)
প্রসবকালীন জটিলতা যেমন বাচ্চার মাথা আটকে যাওয়া
শিশুর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন যেমন জন্মের পর শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে কিনা
ইত্যাদির কারণে মা ও সন্তানের প্রাণঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা হাসপাতাল ছাড়া মোকাবেলা করা কঠিন বা বাড়িতে প্রায় অসম্ভব।
৪️⃣ তাওয়াক্কুল বিষয়ে আমার অবস্থান
পূর্বের ডেলিভারিতেও আমি আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখেছি—দোয়া, যিকির ও ধৈর্যের সাথে। আমি নরমাল ডেলিভারি কিভাবে হবে সে সংক্রান্ত পড়াশুনা করেছি যা এখনও জারি আছে। এমনকি প্রথম প্রসবের সময় ৭১ ঘন্টা লেবার ব্যথা থাকা সত্ত্বেও আমি আল্লাহর সাহায্য আর তাওফিকের উপর পূর্ন আস্থা রেখেছি এবং ১ মুহূর্তের জন্য বিচলিত হইনি।
বর্তমানেও আমি তাওয়াক্কুলের উপর আছি এবং একান্ত প্রয়োজনে একা সন্তান জন্ম দেয়ার মত মানসিক শারীরিক এবং ইমানগত প্রস্ততিও নিয়ে যাচ্ছি। তারপরও ঝুঁকি এড়িয়ে এমন ডাক্তারের তত্তাবধানে থেকে ডেলিভারি করতে চাচ্ছি যিনি আমার নরমাল ডেলিভারি করার পক্ষে আমাকে পূর্ন সহায়তা করবে, কোন প্রকার মেডিক্যাল হস্তক্ষেপ করবেন না এবং আমি যেহেতু এই সংক্রান্ত পড়াশুনা করছি অতএব আমাকে প্রথম ডেলিভারির মত এবারও নরমাল ডেলিভারি করতে সাহায্য করবেন। এরপরও যদি আল্লাহর ইচ্ছায় কোন মেডিকেল ইমার্জেন্সি আসে সেটা তিনি প্রফেশনাল ডাক্তার হিসাবে ট্যাকেল দেয়ার চেষ্টা করবেন ইনশাআল্লাহ।
আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, শরিয়াহতে তাওয়াক্কুল মানে উপযুক্ত ও নিরাপদ উপায় গ্রহণ করে আল্লাহর উপর ভরসা করা, ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে হালাকতের ঝুঁকিতে নিক্ষেপ করা নয়
৫️⃣ ফাতওয়ার জন্য প্রশ্ন
এই প্রেক্ষাপটে আমি জানতে চাই— যেহেতু আমার স্বামী আমার সাথে সুস্থ্য স্বাভাবিক আলোচনা করতেই রাজি নন।
১। শরীয়াহর দৃষ্টিতে, নারীর নিজের প্রাণ ও শরীর-সংক্রান্ত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কতটুকু?
২। স্বামী কি এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন, যেখানে যুক্তিসংগতভাবে প্রাণঝুঁকি বিদ্যমান?
৩। হাসপাতালভিত্তিক ডেলিভারি বেছে নেওয়া কি তাওয়াক্কুলের বিরোধী, নাকি শরিয়াহসম্মত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত?
৪। স্ত্রী যদি নিজের ও অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে তার অবস্থান কী ইমান বা তাকওয়াহর পরিপন্থী?
আপনার শরিয়াহভিত্তিক দিকনির্দেশনা কামনা করছি।