মুহতারাম,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমি আমার বিগত কয়েক বছরের দাম্পত্য জীবন ও তালাক সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে অত্যন্ত পেরেশান। আল্লাহর বিধান আমার জন্য সর্বশেষ সিদ্ধান্ত, তাই সঠিক শরয়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত ঘটনা আপনাদের সামনে পেশ করছি।
পটভূমি
২০২০ সালে ফিতনার মধ্যে পড়ে আমি আমার বাবার অনুমতি ব্যতীত গোপনে বিবাহ করি। আমাদের উভয় পরিবারের কেউই দ্বীনের পথে ছিল না, এখনও নেই। আমার পরিবার শুরু থেকেই এই বিবাহ মেনে নেয়নি এবং স্বামীর পরিবারও বিরোধিতা করেছে। পরিবারগুলো আমাদের বিচ্ছিন্ন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এমনকি পরিবার থেকে একাধিকবার বলতে শুনেছি—তাবিজ/যাদু করেও হলেও তারা এই বিবাহ ভেঙে দেবে।
পরবর্তীতে আমার মত পরিবর্তন করতে না পেরে পরিবার কিছুটা শিথিল হলেও মন থেকে তারা কখনও মেনে নেয়নি।
১. জোরপূর্বক তালাকের কাগজে স্বাক্ষর এবং পুনরায় বিবাহ
বিবাহ প্রকাশ পাওয়ার পর উভয় পরিবার প্রবল বিরোধিতা করে। এক পর্যায়ে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে আমাকে তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়। এরপর আমি প্রায় দেড় বছর গৃহবন্দী অবস্থায় থাকি।
পরবর্তীতে আমরা মনে করি, যেহেতু স্বাক্ষরটি জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল, তাই সেটিকে আমরা গ্রহণ করিনি। এরপর আমরা পুনরায় বিবাহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি।
২. বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব
আমি স্বামীর সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তবে আলাদাভাবে থাকতাম। স্বামী কখনও আমার অর্থনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। আমি সবসময় আমার মা-বাবার উপর নির্ভরশীল ছিলাম।
এই সময় একদিন আমি টানা তিন ঘন্টা ক্লাসে ছিলাম। ক্লাস শেষে ফোনে দেখি সে আমাকে মেসেজে লিখেছে:
“তালাক, তালাক, তালাক।”
এর আগে তার মেসেজে প্রচুর গালিগালাজ ছিল।
কারণ হিসেবে সে বলে, বাইরে থেকে সে নাকি দেখেছে কালো বোরখা পরিহিত এক মেয়ে একটি ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, মেয়েটি আমি—এ ধারণা থেকেই তার ক্রোধ লাগামহীন হয়ে যায় এবং সে তালাক বলে চলে যায়।
তখন তালাক সম্পর্কে আমার সঠিক জ্ঞান ছিল না। অনলাইনে একটি ওয়েবসাইটে পড়ি যে অতিরিক্ত রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক হয় না। এ ধারণার উপর ভিত্তি করে আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি। পরবর্তীতে এ ধরনের রাগের মুহূর্তে সে বহুবার মেসেজ বা কলে একাধিকবার করে “তালাক তালাক তালাক” উচ্চারণ করেছে।
৩. বারান্দায় যাওয়ার ঘটনায় ফোনে তালাক (সাক্ষীসহ)
এক পর্যায়ে আমি তাকে ফতোয়া নেওয়ার জন্য চাপ দিলে সে আমাকে না জানিয়ে বাড়িতে চলে যায়। পরেরদিন ঝগড়ার মধ্যে আমি বাসায় মেহমান থাকার কারণে বারান্দায় গিয়ে কথা বলি। সে বুঝতে পেরে কলের মাধ্যমে বারবার তালাক দেয়। এ সময় আমার খালাতো বোন ফোনে শুনে ফেলে। (সে দ্বীনদার।)
৪. স্বামীর মানসিক অবস্থা ও “ইগলাক” বিষয়ক দাবি
এরপর স্বামী অনলাইনে কোথাও প্রশ্ন করে এবং সেখানে উল্লেখ করে যে সে ২০২১ সালে একটি এক্সিডেন্টের শিকার হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর থেকে তার মেজাজ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এটা সত্য যে তার রাগের মুহূর্তে আমার জীবনও বিপন্ন হয়েছে। ফিজিকাল ভায়লেন্স ঠান্ডা মাথায় মারাত্মক রকম আঘাত করেছে।
তার দাবি অনুযায়ী, রাগের মুহূর্তে সে কী বলেছে বা কেন বলেছে—এসব সে পরে স্মরণ করতে পারে না। সে একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় তালাক বলে ফেলে। এরপর সে “ইগলাক” অবস্থার স্ক্রিনশট/ব্যাখ্যা দেখিয়ে বলে যে এতে তালাক পতিত হয় না। এই যুক্তির কারণে আমি বিভ্রান্ত হয়ে সম্পর্ক বজায় রাখি।
৫. গৃহবন্দী জীবন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তালাককে শর্ত হিসেবে ব্যবহার
এরপর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং আমি আবার বাবার বাড়িতে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকি। আমি বরাবরই স্বামীর আনুগত্য করার চেষ্টা করতাম। এমনকি সে যদি অপমানজনক কিছু করতে বলত, তাও আমি সহ্য করতাম। তবুও সে কখনও সন্তুষ্ট হতো না এবং সবসময় সন্দেহ করত।
২০২৪ সালে আমার নিজের কক্ষ থেকে বের হওয়ারও অনুমতি ছিল না। সে প্রায় ৫০টির মতো কঠোর নিয়ম বেঁধে দেয় এবং নিয়ম ভঙ্গ হলে তালাক হবে—এমন শর্ত আরোপ করে।
এক পর্যায়ে আমি আর সহ্য করতে না পেরে কিছু নিয়ম ভেঙে ফেলি। পরে তাকে বলি, “আমি তো শর্ত ভেঙেছি, তালাক হয়ে গেছে, এবার আমাকে ছেড়ে দাও।” সে তখন বলে—সে নাকি কেবল আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই তালাকের শর্ত দিয়েছে, বাস্তবে তালাকের উদ্দেশ্যে নয়।
২০২৪ সালেই পরিবারের উপস্থিতিতে সে আমার সাথে সম্পর্ক শেষ করতে চায়। ১৫ দিন যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর সে ঠান্ডা মাথায় আমাকে আবার তালাক দেয়। কিন্তু বর্তমানে সে এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।
৬. ২০২৫ সালে আলাদা থাকা এবং পুনরায় তালাক
২০২৫ সালে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আমি তার থেকে আলাদা থাকবো এবং আর সম্পর্ক রাখবো না। আমি নিজের দিকে মনোযোগী হই, ইলম অর্জন ও উপার্জনের চেষ্টা করি। এই সময়ও সে আমাকে তিনবার তালাক দেয়।
৭. পরীক্ষা হিসেবে ঘটনা সাজালে একসাথে তিন তালাক
পরে সে ক্ষমা চায় এবং আমি ফতোয়া নেওয়ার জন্য জোর করলে কিছুটা রাজি হয়। সে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে স্ক্রিনশট এনে আমাকে দেখাতে থাকে।
একদিন আমি তাকে পরীক্ষা করার জন্য একটি মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে বলি। সে মুহূর্তের মধ্যে একসাথে তিন তালাক বলে দেয়। পরে আমি বলি যে আমি পরীক্ষা করেছি। তখন সে কান্নাকাটি করে, হাত-পা ধরে ক্ষমা চাইতে থাকে।
তালাক হয়েছে কি হয়নি এটা নিয়ে সন্দেহ হওয়ার মুল কারন কালো জাদু। অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
১. তাবিজ/যাদু সংক্রান্ত ঘটনা
স্বামীর ভাষ্যমতে, ২০২৩ সালে ঢাকায় থাকা অবস্থায় আমার মা নাকি আমার শাশুড়িকে ফোনে বলেছেন যে তিনি কুমিল্লা গিয়ে কামরূপ কামাক্ষ্যা তান্ত্রিক দিয়ে তাবিজ করাবেন।
আমি বাবার বাসায় আমার নাম লেখা তাবিজ পাই। এগুলো আমি মাকে দেখালে তিনি দ্রুত আমার নাম লেখা কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন। পরে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি কুরআন ছুঁয়ে বলেন:
“এই তাবিজ আমি করিনি।”
পরবর্তীতে তিনি এক মহিলা রাকির কাছে পরামর্শ নেন। সেই মহিলা নাকি বলেন, আমাকে পাগল করার জন্য তাবিজ করা হয়েছে এবং এটি কামরূপ কামাক্ষ্যা তান্ত্রিক দ্বারা করানো হয়েছে। কে করিয়েছে সে জানে, তবে প্রকাশ করবে না।
২. স্বামীর জ্বীন/রাতের সমস্যা
২০২৩ সাল থেকে স্বামী জ্বীনের সমস্যায় ভুগছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী রাতে তাকে গলা টিপে ধরা হতো। ঘরে মানুষ থাকলেও সে ঘুমাতে পারত না। এখনও সে রাতে জেগে থাকে এবং দিনে ঘুমায়।
৩. মানসিক অসুস্থতার সম্ভাবনা
স্বামীর আচরণে মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা যায়। schizophrenia / borderline personality disorder-এর ছায়া রয়েছে বলে মনে হয়। তার রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডাক্তার দেখানো এবং ওষুধ খাওয়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
আমরা এক ভাইয়ের মাধ্যমে রুকিয়া ডায়াগনোসিস করিয়েছি। সেখানে বিচ্ছেদের যাদুর অনেক লক্ষণ আমাদের মধ্যে পাওয়া গেছে।
উপরে উল্লেখিত ঘটনা অনুযায়ী আমার তালাক সম্পন্ন হয়েছে কিনা? আর হয়ে থাকলে কিভাবে লিখিত ফতোয়া পাবো?