আমি একটি মহিলা আলিয়া মাদ্রাসার মহিলা শিক্ষিকা। জেনারেল সাবজেক্ট পড়াই, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)। মেয়েদের চাকরি করা নিয়ে নানা জনের নানা মত প্রচলিত আছে। কারো মতে নারী শিক্ষক দরকার। যা হোক কিছুটা পারিবারিক চাপেই চাকরিতে ঢোকা।
আমি একমাত্র সন্তান। মা এর কথা হচ্ছে: আমার চাকরি থাকলে আমি তাতের বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করতে পারবো এবং আমার নিজেরও অবলম্বন যেহেতু আমার ভাই নেই। বাবার পক্ষ থেকেও চাকরির তাগাদা।
বিয়ে নিয়ে নানা জটিলতায় বিয়ে হচ্ছে না। বাসা থেকে চাকরির চাপ। এ অবস্থায় চাকরি ছাড়া আর আশ্রয় কোথায়??
মেয়েদের রিজিকের ব্যবস্থা করবে বাবা, স্বামী, ছেলে ইত্যাদি। কিন্তু ওভারঅল সিচুয়েশনে মনে হয় বিয়ে যদি কখনই না হয়, এমনটা তো অসম্ভব না, বৃদ্ধ বয়সে আমার রিজিকের দায়িত্ব কে নেবে? খিলাফাহও তো নেই, তাই ভালো সরকারি চাকরি দরকার মনে হচ্ছে আপাতত ভালো অবলম্বন। রিজিক তো আল্লাহই দিবে, কিন্তু সেটা তো আমাদের চেষ্টার মধ্য দিয়েই দিবে। এজন্য চাকরি ছাড়া আর কী চেষ্টাই বা করতে পারি? ফ্রিল্যান্সিং এর দিকে যেতে চাচ্ছি না। প্রায় বছরখানেক করেছিলাম, অনলাইন কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে এটি ফিতনামুক্ত নয়, আমার অভিজ্ঞতায়, প্রচুর ওয়ান টু ওয়ান কমিউনিকেশন করতে হয়, তাই ছেড়ে দিয়েছি। মাদ্রাসায় চাকরি করি, যদিও পুরোপুরি পর্দা সম্ভব হয় না, তবে তুলনামূলক ভালো। সরকারী মহিলা কলেজ, কম্পিউটার প্রোগ্রামার - এই চাকরিগুলোও মোটামুটি ভালো মনে হয়। তাই চাচ্ছি এগুলোর জন্য চেষ্টা করতে। রিজিকের ওসিলা হিসেবে। আর যদি এর বাহিরে কোনো পুরুষ এসে আমার রিজিকের দায়িত্ব নেয় (বিয়ে) তো আলহামদুলিল্লাহ, তখন হয়তো চাকরির দরকার হবেনা। কিন্তু বর্তমানে তো সেই সিচুয়েশন না।
এর আগে চিন্তা করতাম, রিজিক তো আল্লাহর নির্ধারিত। তাই পরিবারের অগোচরে চাকরির পড়াশোনা ছেড়ে দিছিলাম। ইলম অর্জনের জন্য মাদানী নেসাব অনলাইনে ভর্তি হয়েছিলাম।
কিন্তু রিসেন্ট একটা বইতে পড়েছি যে নির্ধারিত রিজিক আমাদের চেষ্টার মধ্য দিয়েই আসবে।
এছাড়া ইউটিউবে বেশ কিছু লেকচারে শুনেছি দুনিয়াবি যে বিষয় নিয়ে আমি পড়াশোনা করছি আমাকে সেই বিষয়ে সর্বোচ্চ পরিমান দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিৎ এবং সাথে ফরজে ইলম। দুনিয়াবি পড়াশোনা না ছেড়ে দিতে বলা হয়। তাহলে আমি যেন আরো দক্ষ শিক্ষক হই। চাকরির পড়াশোনা যদি করিই তাহলে যেন আরো ভালে করে করি, যেন কোনে সরকারি ভালে কলেজের ভালে মহিলা শিক্ষক হতে পারি। অথবা যদি প্রোগ্রামার হই যেন দক্ষ প্রোগ্রামার হই। সাথে ফরজ ইলম। ওইসব যায়গায় গিয়ে যেন দ্বীনি কাজ করি।
মাদানী নেসাব এর পড়া, চাকরির পড়া দুটো একসাথে কন্টিনিউ করা কঠিন হয়ে গেছে, প্রায় অসম্ভব বলা যায়। দারসের হক ঠিকমতো আদায় করতে পারছি না।
মাদানী নেসাবে প্রচুর পড়া। এটা যদি আমি কন্টিনিউয়াসলি প্রাকটিস না রাখি তাহলে তো জ্ঞান ধরে রাখতে পারতেসি না, ভুলে যাই। জ্ঞান অর্জন করে যদি প্রাটিসের অভাবে জ্ঞান ভুলে যাই এটা তো আরেকটা খারাপ বেপার। কোর্স শুরু করার আগে ভেবেছিলাম দুই ঘন্টা ক্লাস করাই যথেষ্ট, কিন্তু শুরু করার পরে দেখি পড়া রেডি করা, আমালুল বাইত করা, তাকরার করা, মুতায়ালা করা এতে তো অনেক সময় প্রয়োজন। দারসের হক ঠিকমতো আদায় করতে পারছি না।
এই কোর্সে আরবি ভাষা শিক্ষার উপর প্রচুর গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক শব্দার্থ মনে রাখতে হয়, যেটা পারতেসি না। আমি মুখস্থ বিদ্যা একদমই কম পারি, জেনারেল পড়াশোনা যে করছি সেখানেও টেকনিক্যাল বিষয় পড়েছি যা মুখস্থ বিদ্যা নয়। এক্ষেত্রে যদি আমি এই কোর্স বন্ধ করিও, তাহলে পরবর্তীতে কি আমার এমন কোনো কোর্স করা উচিৎ যেখানে মুখস্থ করা কম লাগবে, বুঝে পড়ার জিনিস বেশি, তাহলে সেগুলো কী কী কোর্স?
বর্তমান কোর্সটি আমি আমার নিজের ইচ্ছায় করছি। পরিবারের সমর্থন নেই। মা এ বেপারের আগেও নেই, পিছেও নেই। বাবার মতে জেনারেলদের নাহু সরফ শিখে হবে কী? মামার মতে আরবী গ্রামার শিখে হবে কী? বাবা মামা দুজনেই আলিম।
আলিম পরিবারে বড়ো হবার কারনে পরিবার থেকেই দ্বীনি অনেক কিছু শিখেছি, তবে তাতে ফরজ ইলম সম্পুর্ণ হয়েছে কি না বুঝতে পারতেসি না। আবার অনেক কিছু শিখেছি মকসুদুল মুমিনিন বই পড়ে, কিন্তু এখন জানতেসি এই বইয়ের সব সঠিক না। এখন আমার যে ইলম আছে এর কতটুকু সঠিক বা ভুল তাও জানিনা।
মা এর মতে আমি বাসা থেকে যতটুকু শিখেছি তাতে ফরজ ইলম হয়েছে। তার মতে আমি যেন জরুরী ইবাদতটুকু ঠিক রাখি আর চাকরির পড়া পড়ি।
এখন পড়াশোনা নিয়ে আমার সামনে দুটো পথ দেখছি:
১। চাকরির পড়াশোনা পরিবারের অগোচরে বাদ দিয়ে মাদানী নেসাব নিয়ে পরে থাকা।
২। চাকরির পড়াশোনা করা এবং সাথে শুধু ফরজে ইলম কোর্স করা। এর পরে যখন চাকরির পড়াশোনা শেষ হবে তখন পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গভীর ইলম অর্জন করা।
আমি কোন দিকে যাবো? অথবা এর বাহিরে উপরের সামগ্রিক বিষয় মিলিয়ে যদি অন্য কোন পথ বাতলে দেন, ইলম ও হিকমাহ দিয়ে পরামর্শ আশা করি।