আমার এক পরিচিত বড় ভাই এর মুখে শুনলাম, কন্টেন্ট নিজে হালাল হলে ফেসবুক-ইউটিউব তথা সোশাল মিডিয়ায় প্রদর্শিত ইনস্ট্রিম এড থেকে প্রাপ্ত অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ হবে। এক্ষেত্রে তিনি আমাকে যে যুক্তি দিলেন তা উল্লেখ করছি:
১। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ফেসবুক বা ইউটিউব একটি কর্পোরেট প্ল্যাটফর্ম, যার মালিকানা সম্পূর্ণভাবে কোম্পানির হাতে। কোনো ব্যক্তি সেখানে একটি একাউন্ট খুললে সে ওই স্পেসের মালিক হয়ে যায় না; বরং সে কেবল একটি সীমিত ব্যবহারের অনুমতি (মূলত কন্টেন্ট আপলোড করার অনুমতি) পায়। কিন্তু কন্টেন্ট প্রদর্শিত হবে কি না, কার কাছে প্রদর্শিত হবে, কতক্ষণ প্রদর্শিত হবে, একাউন্ট সক্রিয় থাকবে না বন্ধ হবে, মনিটাইজেশন দেওয়া হবে কি না, দেওয়া হলেও সেখানে বিজ্ঞাপন দেখানো হবে কি না, আর দেখানো হলে কোন বিজ্ঞাপন দেখানো হবে এই সব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে। কন্টেন্ট নির্মাতার এখানে কোনো মালিকানা নেই, এমনকি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নেই।
এই কারণে কন্টেন্ট নির্মাতার অবস্থান মালিকের নয়; তার অবস্থান ভাড়াটিয়ার। একজন ভাড়াটিয়া যেমন একটি বাসায় থাকে, ব্যবহার করে, কিন্তু মালিকের সিদ্ধান্তের অধীন থাকে; ঠিক তেমনই কন্টেন্ট নির্মাতা একটি ডিজিটাল স্পেস ব্যবহার করে, কিন্তু সেই স্পেসের ব্যবস্থাপনা তার হাতে থাকে না। একইভাবে যারা বিজ্ঞাপন দেয়, তারাও ভাড়াটিয়া। কথার কথা: ১০ মিনিটের একটা ভিডিওতে ২০ সেকেন্ডের জন্য তারা স্পেসটা ভাড়া নিল। অর্থাৎ ফেসবুক-ইউটিউবের আইডি বা একাউন্টটির মালিক আসলে ভাড়াটিয়া, আর তার ওই একাউন্টের কন্টেন্টের মধ্যে কিছু সময় একটি বিজ্ঞাপনী কোম্পানিও ভাড়া নিচ্ছে।
২। যারা বলেন, কন্টেন্ট থেকে আয় হয় না, আয় হয় বিজ্ঞাপন থেকে, তারা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাস্তবে যা ঘটে তা হলো; কন্টেন্ট না থাকলে কোনো বিজ্ঞাপনই আসে না। কেউ শুধু একটি চ্যানেল খুলে রেখে দিলে সেখানে কোনো বিজ্ঞাপন দেখানো হয় না। আবার নিম্নমানের বা দর্শকহীন কন্টেন্টেও কার্যকরভাবে বিজ্ঞাপন আসে না। আবার সবই আছে, কিন্তু দর্শক ভিডিওটি ওপেন করছে না, তাহলেও সেখানে কোনো বিজ্ঞাপন আসবে না। অর্থাৎ একটি মানসম্মত কন্টেন্ট নির্দিষ্ট সময় ধরে চালিয়ে নির্দিষ্ট ওয়াচটাইম পূরণ করলে, কন্টেন্ট চলমান অবস্থাতেই যেহেতু কেবল বিজ্ঞাপন দেখানো হয় যা থেকে আয় হয়, কাজেই এই আয়ের জন্য কন্টেন্টই মূল কারণ। কিন্তু আয়ের অঙ্কটা কত হবে তা নির্ধারিত হয় বিজ্ঞাপনের ক্লিক সংখ্যা দিয়ে, কারণ কন্টেন্টের কোয়ালিটি মাপা যায় না। যেমনঃ একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়ানোর কারণেই বেতন পান, কিন্তু বেতনটা ধার্য হয় ঘন্টার প্রেক্ষিতে।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য আরেকটি পরিচিত উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। সরকারি জিপিএফ (GPF) এর ক্ষেত্রে সরকার জমাকৃত টাকার ওপর বর্ধিত অংশ গণনা করে সুদের নিয়মে। এমনকি সরকার এটাকে "সুদ"ই বলে, কিন্তু আলেমরা বলেন, এটা রিওয়ার্ড, জায়েজ। কারণ গ্রাহকের কর্তিত টাকার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; সে টাকা কোথায় বিনিয়োগ হবে, কীভাবে বাড়বে, সুদী ব্যাংকে যাবে কি না;এর কোনোটাই তার সিদ্ধান্তে নয়। এই সুদ সরকার ও ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত, গ্রাহকের সাথে নয়; গ্রাহকের জন্য তা একটি রিওয়ার্ড বা বর্ধিত প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩। আরও একটি বাস্তব দিক হলো; বিজ্ঞাপনদাতা যে অর্থ দেয়, তা সরাসরি কন্টেন্ট নির্মাতার কাছে আসে না। প্রথমে সেই অর্থ ফেসবুক-ইউটিউবের সম্পদে পরিণত হয়। এরপর তারা তার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী সেই আয় থেকে কর্মীদের বেতন ও কন্টেন্ট নির্মাতাকে অর্থ প্রদান করে। ফলে নির্মাতার প্রাপ্ত অর্থ কোনো নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনদাতার অর্থ হিসেবে চিহ্নিত নয়; বরং ফেসবুক-ইউটিউবের সামগ্রিক আয়ের ভাণ্ডার থেকে প্রদত্ত একটি রিওয়ার্ড।
৪। এখন দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আসা যাক। একটা কন্টেন্ট দেখতে শুরু করলে এর ফাঁকে বিজ্ঞাপন আসে ঠিকই, কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন কিন্তু কন্টেন্টের অংশ হয়ে যায় না। যেমন: আপলোডকৃত একটি ভিডিও ডাউনলোড করলে তার ভেতর ওই বিজ্ঞাপনটা পাওয়া যায় না। তারমানে সেটার অস্তিত্ব স্বতন্ত্র। কন্টেন্ট নির্মাতা তা তৈরি করেনি, এমনকি পরেও তা কন্টেন্টের অংশ হয়ে যায়নি। বিজ্ঞাপন চলাকালে কন্টেন্ট থেমে থাকে, কণ্টেন্ট চলাকালে বিজ্ঞাপন থেমে থাকে, কাজেই অন্যের কৃত কর্মের উপর কন্টেন্ট নির্মাতার পাপ হবে কেন? বরং কন্টেন্ট নির্মাতা ও বিজ্ঞাপনদাতা উভয়েই একই স্পেস ভাড়া নিয়েছে, একজন তার জিনিস কিছুক্ষণ প্রদর্শন করছে, আরেকজন তার জিনিস কিছুক্ষণ প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি চলছে। যেমনঃ একটা মঞ্চে একজন কুরআন তিলাওয়াত করছে ৫ মিনিট, এর মাঝে একজন যদি গান গেয়ে যায় ১০ সেকেন্ড, এরপর আবার কুরআন তিলাওয়াত হয় তাহলে এখানে তিলওয়াতকারীর পারিশ্রমিক নিতে দোষ নেই, যদিও সেই হাদিয়ার টাকাটা মঞ্চের মালিক গানবাবদ অর্জিত অর্থ থেকেই ইনকাম করেন, যিনি কিনা একই মঞ্চ দুজনকে একইসাথে ভাড়া দিয়েছেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহ সহ বড় বড় ইসলামি সেলিব্রিটিদের ভিডিওতে এড আসে, কিন্তু তারা বলেন যে তারা মনিটাইজেশন করেননি। প্রশ্ন হলো: যদি ফেসবুক-ইউটিউবে হালাল কন্টেন্টের মধ্যে হারাম এড দেখানো হবে জেনেও সেখানে কন্টেন্ট বানানো জায়েজ হয় তাহলে জায়েজ কাজ করে পারিশ্রমিক/হাদিয়া নেওয়া কেন জায়েজ হবে না? আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে আজ পর্যন্ত কোনো আলেম ফেসবুক-ইউটিউবে কন্টেন্ট বানাতে নিষেধ করেননি।
৫। দর্শকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দর্শক জানে যে ইউটিউব বা ফেসবুক একটি বিজ্ঞাপনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। সে চাইলে বিজ্ঞাপন শুরু হওয়া মাত্র ভিডিও ছেড়ে যেতে পারে, কিংবা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিজ্ঞাপন কোনো নির্দিষ্ট কন্টেন্ট নির্মাতার জন্য তৈরি নয়; বরং প্ল্যাটফর্মজুড়ে একই বিজ্ঞাপন বিভিন্ন কন্টেন্টের মাঝে প্রদর্শিত হয়। তাহলে দর্শক ফেসবুক-ইউটিউবে ঢুকেছে মানেই সে বিজ্ঞাপন দেখতে প্রস্তুত, সেক্ষেত্রে দর্শককে যারা বিজ্ঞাপন দেখাল, আর দর্শক যাদের বিজ্ঞাপন দেখল এসবের মাঝে কন্টেন্ট নির্মাতা দোষী হয় কী করে? দর্শক তার কন্টেন্ট না দেখে অন্যের কন্টেন্ট দেখলেও তো একই বিজ্ঞাপন দেখতে পারত?
৬। অনেকে বলেন, ইন স্ট্রিম এড ছাড়াও তো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর কন্টেন্টের মাধ্যমে প্রডাক্টের বিজ্ঞাপন করে আয় করতে পারেন। কিন্তু এই কথা অনেক দিক থেকেই বাস্তবসম্মত নয়। যেমন: যিনি কন্টেন্ট নির্মাণ করছেন তিনি যে নিজে বিজ্ঞাপন করতেও সিদ্ধহস্ত হবেন তেমনটা নাও হতে পারে। ফলে তিনি বিজ্ঞাপন নাও পেতে পারেন। আর সব প্রোগ্রামের মাঝে প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্ভবও নয় , যেমন পডকাস্টের মধ্যে বলা যায় এটা হচ্ছে অমুক কোম্পানির সৌজন্যে, কিন্তু কুরআন-তিলাওয়াতের মাঝে এমনটি বলা সম্ভব না। আবার এভাবে সবাই প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন শুরু করলে এত বিজ্ঞাপনদাতা পাওয়াও যাবে না যারা এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন করতে রাজি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াচটাইমের উপর ভিত্তি করে ফেসবুক-ইউটীউব যেভাবে মনিটাইজেশন দেয় এভাবে সেটা সহজ হবে না, শুধু সেলিব্রিটি কন্টেন্ট নির্মাতারাই কিছু বিজ্ঞাপন পাবেন, কিন্তু যাদের ফলোয়ার কম কিন্তু ভালো কন্টেন্ট বানায় তারা কিছুই পাবে না। অথচ ফেসবুক-ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপন নিলে তারা কিছুটা হলেও আয় করতে পারত, যা তাদের ভিডিও নির্মাণের খরচ উঠাতে সহায়তা করত। তো যেহেতু ভিডিও নির্মাণ একটি খরচসাপেক্ষ, সময় ও শ্রমসাপেক্ষ বিষয়, মনিটাইজেশন না নিলে, আয় না হলে কেউ এই খরচ করতে যাবে না, ফলে দিনে দিনে শরিয়তমান্যকারীদের কন্টেন্ট কমে যাবে এবং ফাহেশা কন্টেন্ট দেখেই মানুষ সময় নষ্ট করবে।
এসব বিবেচনায় বলা যায় এটা জায়েজ হতে পারে।"
উক্ত ভাইয়ের এই কথাগুলো কি সঠিক?