আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি এমন একটি সংসারে আছেন যেখানে:
আপনার স্বামী নিয়মিত ভরণপোষণ দেন না,
আপনাকেই আর্থিকভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে,শ্বাশুড়ি ফিতনা ও গিবতে লিপ্ত,
স্বামী রাগী, অপমান করে কথা বলে,
ধর্মীয় দায়িত্বে অবহেলা করে,
এবং মানসিক শান্তি একেবারেই অনুপস্থিত।
এই পরিস্থিতি শরীয়ত ও নৈতিকতার দিক থেকে আপনার করণীয় তুলে ধরছি।
স্বামীর দায়িত্ব শরীয়তের আলোকেঃ-
ভরণ-পোষণ,
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
"পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।"
— [সূরা আন-নিসা ৪:৩৪]
অর্থাৎ, স্বামী হচ্ছে স্ত্রীর আর্থিক অভিভাবক।
স্ত্রী যদি নিজের আয় দিয়ে সংসার চালান, সেটা তার অনুগ্রহ, কিন্তু দায়িত্ব নয়।
সুতরাং,
যদি স্বামী সচেতনভাবে কামাই না করে, অথচ সক্ষম, তবে সে গুনাহগার।
---
★স্ত্রীর প্রতি সম্মান ও আচরণ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করে।"
— (তিরমিজি, হাদীস: ৩৮৯৫)
আপনার বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিচ্ছেন, অপমান করছেন, তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত থাকেন — এগুলো ইসলামে হারাম আচরণ।
এমনকি, স্ত্রীর সম্মানহানি, গালাগাল, ভয় দেখানো — এগুলো নাফরমানি এবং আল্লাহর শাস্তির কারণ।
★ শ্বাশুড়ির পক্ষ হতে ফিতনা অপমান
শরীয়তে শ্বাশুড়ির প্রতি সম্মান অবশ্যই বজায় রাখতে হয়, কিন্তু তার ফিতনা, গীবত, অপবাদ বা জুলুম সহ্য করা বাধ্যতামূলক নয়।
আপনি যদি দেখেন, তার উপস্থিতিতে আপনার সংসারে ফিতনা সৃষ্টি হয়, তবে শরীয়তের দিক থেকেও আপনি স্বামীকে অনুরোধ করতে পারেন যেন কিছু দূরত্ব বজায় রাখেন বা আলাদা থাকেন।
---
যদি স্বামী নামাজ না পড়ে, দ্বীনের প্রতি গাফেল, আপনাকে অপমান করে, ভরণপোষণ দেয় না — তবে আপনি নিম্নলিখিত ধাপে পদক্ষেপ নিতে পারেন:
★নরম পরামর্শ ও দীনী উপদেশ
শান্তভাবে তাকে দীন বোঝানোর চেষ্টা করুন।
উস্তায, আলেম বা পরিবারের প্রভাবশালী কাউকে জানিয়ে সমাধানের চেষ্টা করুন।
★উভয় পরিবারের মুরব্বিদের নিয়ে পারিবারিক সালিশ বসাতে পারেন।
কুরআনের নির্দেশ:
“তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা কর, তবে উভয় পক্ষ থেকে একজন সালিস নিয়োগ করো...”
— [সূরা আন-নিসা ৪:৩৫]
অর্থাৎ, আপনার ও তার পরিবার থেকে একজন করে সালিশ বসিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
★ যদি মানসিক/শারীরিক নির্যাতন বাড়ে, আপনি সাময়িক ভাবে কিছুদিনের জন্য আলাদা থাকতে পারেন।
এ সময়ও তাকে ইসলামী দৃষ্টিতে তাওবা ও পরিবর্তনের সুযোগ দিন।
যদি তবুও সংশোধন না আসে, এবং আপনি সত্যিই কষ্টে থাকেন —
তাহলে শরীয়তের দিক থেকে আপনি খোলা তালাক চাইতে পারেন।
খোলা তালাক বৈধ যখন:
স্বামী ধর্মে গাফেল,
নির্যাতন করে,
ভরণপোষণ দেয় না,
বা সংসারকে অসহনীয় করে তোলে।
বিশেষ ওযর ছাড়া তালাকের আবেদন করা যাবেনা।
রাসুল ﷺ বলেছেন:
"যে নারী বৈধ কারণ ছাড়া স্বামীর কাছ থেকে খুলা চায়, তার জন্য জান্নাতের সুবাস হারাম হবে।"
(আবু দাউদ ২২২৬)
আপনি যা বলেছেন — তার আচরণ বদলে যাওয়া, কণ্ঠ ভারী হওয়া, অচেতনতা ইত্যাদি — এগুলো জ্বিন বা ওয়াসওয়াসা হতে পারে, আবার মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও হতে পারে।
এক্ষেত্রে করণীয়:
নিয়মিত রুকইয়াহ শরয়িয়াহ করুন (সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস)।
নিজে ও স্বামী উভয়ে আমল করুন, বিশেষত সকালে ও রাতে এই আয়াতগুলো পড়া।
একই সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত হাফেজ বা রুকইয়াহ-জ্ঞানে অভিজ্ঞ আলেম এর পরামর্শ নিন।
★নিজের ঈমান ও আমল রক্ষা করুন
যা-ই হোক না কেন, নিজের দীন ও আমল যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় — এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দুআ, ইস্তেগফার চালিয়ে যান।
যদি সংসারে শান্তি না থাকে, আল্লাহর কাছে সোজাসুজি দুআ করুন —
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহু, ও আউযু বিকা মিন শাররিহি।”
★আপনি আরো যা করতে পারেন-
আল্লাহর কাছে দোয়া ও ধৈর্য
প্রতিদিন নামাজের পর দোয়া করুন যেন আল্লাহ আপনার স্বামীকে হিদায়াত দেন।
দোয়া করুন যেন আপনার ধৈর্য ও মনের শান্তি অটুট থাকে।
শান্তভাবে কথা বলুন (রাগ বা কান্না নয়)
একটি সময় বেছে নিন যখন তিনি শান্ত থাকেন,
নরম ভাষায় বলুন:
“আমি জানি আপনি চেষ্টা করছেন বদলাতে, আমি শুধু চাই আপনি সত্যিই আল্লাহর জন্য পরিবর্তন হোন, কারণ এসব জিনিস আমাদের সম্পর্কে আঘাত দেয়।”
এরকম কথা অপরাধবোধ তৈরি করে, কিন্তু অপমান করে না।
★সু-প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি বোন,
তার অন্তরে আপনার প্রতি প্রবল মুহাব্বত ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করার পরামর্শ থাকবে।
এক্ষেত্রে কিছু কৌশল ও কর্মপন্থা আছে,
যেগুলো অবলম্বন করলে স্ত্রী স্বামীর
ভালোবাসা পেতে পারেন। যেমন-
তার সামনে সুন্দর/আকর্ষণীয় পোশাক পড়ুন। আপনার চুল সব সময় আঁচড়ে রাখুন।
আপনার স্বামী বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সময় দরজায় এমন ভাবে ছুটে যান যেন আপনি তারই অপেক্ষায় ছিলেন। দরজা খোলার সাথে সাথেই হাসিমুখে সালাম দিন। ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই সমস্যার কথা বলা শুরু করবেন না। তাকে কিছুটা মানসিক বিরতি দিন।
শাশুড়ির সাথে ভাল আচরণ করুন।
আপনার স্বামীর এমন বিষয়ে প্রশংসা করুন যে বিষয়ে তিনি নিজে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন।
আপনার স্বামীকে মাঝে মধ্যে কোন গৃহস্থালি কাজ দিন, কাজটি করে ফেললে তাকে ধন্যবাদ জানান। এতে সে আরও উৎসাহিত হবে। সে যখন কোন একঘেয়ে কথা বলে, তার কথা ধৈর্য ধরে শুনুন।
আপনার স্বামীকে বারবার বলুন আপনি তাকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন।
স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাহিরে যাবেন না, আর তাকে না জানিয়ে তো অবশ্যই বের হবেন না। আপনার স্বামী আপনার জন্য কষ্ট করে কাজ করে উপার্জন করছেন এবং আপনার খাওয়া-পরার বন্দোবস্ত করছেন- এই ব্যপারটির সবসময় প্রশংসা করুন।
প্রতি ওয়াক্তের নামাজে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের মধ্যকার ভালবাসার ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে দেন এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন। দোয়ার মত কার্যকরী কিছুই নেই। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভালবাসা তখনই থাকে যখন আল্লাহ তাদের মাঝে এটা দেন। তাহাজ্জুদ নামাজের সময় তাকে ডাকুন এবং আপনার সাথে তাকেও নামাজ পড়তে বলুন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের দুজনকেই মুত্তাকী হতে সাহায্য করেন।
সর্বাগ্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করুন। যদি সমস্ত স্ত্রীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টায় রত থাকে, নিশ্চিতভাবেই তারা তাদের স্বামীদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারবে।
(সংগৃহীত।)
তবে কেহ কেহ নিম্নের আমলের কথা বলেছেন,যদিও আমলটির দলিল নেই,তবে বুযুর্গানে দ্বীন বলে থাকতে পারেন।
এ আমলটি করা যেতে পারে।
ﻭَﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻣَﻦْ ﻳَﺘَّﺨِﺬُ ﻣِﻦْ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺃَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻳُﺤِﺒُّﻮﻧَﻬُﻢْ ﻛَﺤُﺐِّ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺃَﺷَﺪُّ ﺣُﺒًّﺎ ﻟِﻠَّﻪِ ﻭَﻟَﻮْ ﻳَﺮَﻯ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮﺍ ﺇِﺫْ ﻳَﺮَﻭْﻥَ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏَ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻘُﻮَّﺓَ ﻟِﻠَّﻪِ ﺟَﻤِﻴﻌًﺎ ﻭَﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺷَﺪِﻳﺪُ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ
(সুরা বাকারা : আয়াত ১৬৫)
যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকে তখন স্ত্রী মিষ্টি জাতীয় বস্তুর ওপর এ আয়াত পাঠ করে দম (ফুঁ) করবে এবং স্বামীকে তা আহার করাবে। আল্লাহর ইচ্ছায় অসন্তুষ্ট স্বামী স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট হবে।