আপনি যেই হাদীসটির কথা উল্লেখ করেছেন,তাহা হলোঃ-
رُوِيَ عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ:
«لَقَدْ أُنْزِلَتْ آيَةُ الرَّجْمِ وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا، وَلَقَدْ كَانَتْ فِي صَحِيفَةٍ تَحْتَ سَرِيرِي، فَلَمَّا مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ تَشَاغَلْنَا بِمَوْتِهِ، فَدَخَلَ دَاجِنٌ لَنَا فَأَكَلَهَا»
অনুবাদ
আয়িশা (রাযি.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন—
“নিশ্চয়ই রজমের আয়াত এবং প্রাপ্তবয়স্ককে দশবার দুধ পান করানোর (হুকুমের) আয়াত নাজিল হয়েছিল।
এবং সেগুলো একটি কাগজে লেখা ছিল, যা আমার খাট/বিছানার নিচে ছিল।
যখন আল্লাহর রাসূল ﷺ ইন্তিকাল করলেন, আমরা তাঁর মৃত্যুতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সেই সময় আমাদের একটি গৃহপালিত ভেড়া/ছাগল এসে সেই কাগজটি খেয়ে ফেলল।”
(ইবনে মাজাহ ১৯৪৪)
হাদীসটির হুকুম — কেন এই হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়
মুহাদ্দিসদের সর্বসম্মত মূল্যায়ন:
শাইখ আল-আলবানী: ضعيف جداً ("অত্যন্ত দুর্বল")
ইবনে হাজর: إسناده لا يصح ("ইসনাদ সহীহ নয়")
ইমাম বুখারী: فيه نظر ("গ্রহণযোগ্য নয়")
শাওকানী: السند فيه انقطاع
ইসনাদে আছে محمد بن إسحاق — তিনি مدلس এবং এখানে “عن” ব্যবহার করেছেন → ইসনাদ ভাঙা।
দুর্বল ইসনাদ, আকীদাহ, কুরআন, শরীয়াহর কোনো বিষয় প্রমাণ করতে ব্যবহার করা যায় না।
হাদীসটি কি বোঝায়?
১. “রজম” ও “দশবার দুধ পান” — এগুলো কখনোই কুরআনের আনুষ্ঠানিক অংশ ছিল না, বরং এক সময়কার হুকুম, যার কিছু অংশ পরবর্তীতে নাসিখ হয়েছে।
২. কাগজটি ছিল ব্যক্তিগত নোট, কুরআনের পাতা নয়।
৩. ছাগল কাগজ খেয়েছে → কুরআনের কোথাও ক্ষতি হয়নি, কারণ কুরআন তখনই মুখস্থ ছিলেন শত শত সাহাবী, এবং লিখিত অবস্থায়ও বহু জায়গায় সংরক্ষিত ছিল।
“ছাগল আয়াত খেয়ে ফেলল” — হাদীসটি সহীহ নয়
আপনি যে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন, তা সুনান ইবনে মাজাহ ১৯৪৪। হাদীস বিশেষজ্ঞদের মতে,
এটি সহীহ নয়, বরং দুর্বল (ضعيف / ضعيف جداً)
মুহাদ্দিসদের মূল্যায়ন:
মুহাদ্দিসহুকুম
ইমাম বুখারী বলেন,দুর্বল (ضعيف)
ইমাম ইবনে হাজর বলেন,খুবই দুর্বল
ইমাম সুতী বলেন অগ্রহণযোগ্য
আল-আলবানী বলেন, ضعيف جداً (খুব দুর্বল)
শাওকানী বলেন,سند তে সমস্যা — গ্রহণযোগ্য নয়
কারণ:
এই বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবন ইসহাক আছেন, যিনি “مدلس” এবং এখানে সরাসরি শুনেছি বলেননি — অর্থাৎ ইসনাদ ভাঙা (منقطع)।
দুর্বল হাদীস → কুরআনের বিরুদ্ধে হুজ্জত হতে পারে না
দুর্বল হাদীস → আকীদাহ, শরীয়াহ বা কুরআন বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়
★হাদীসে উল্লেখিত আয়াত—কোনোটিই “কুরআনের অংশ” ছিল না
এখানে দুইটি বিষয় রয়েছে:
1. রজমের আয়াত (পাথর নিক্ষেপের শাস্তি)
2. বড়দের দশবার দুধ পান করানোর রায়
মুহাদ্দিস ও ফুকাহাদের বক্তব্য:
(A) রজমের “আয়াত” — ছিল কেবল حكم (আইন), কুরআনের অংশ নয়
উমর (রাঃ)-এর বর্ণনাও স্পষ্টভাবে বলে —
"الرجم حقٌّ… ولكن لا أكتبها في المصحف"
“রজম সত্য, কিন্তু এটি ‘মুসহাফে’ লেখা হয়নি।”
অর্থাৎ:
এটি ওহীর নির্দেশ/হুকুম ছিল
কিন্তু কুরআন হিসেবে নাজিল হয়নি, তাই কুরআনে কখনোই ছিল না
তাই “ছাগল খেয়ে ফেলেছে বলে কুরআন হারিয়েছে” — এই দাবি সহীহ নয়।
(B) “দশবার দুধ পান” — এটি ছিল নাসিখ-মানসুখ বিষয়
আয়েশা (রাঃ) নিজেই বলেছেন—
প্রথমে “দশবার দুধ পান” দ্বারা মাহরাম হয়
পরে সেটি ৫ বার-এ নাসিখ (রদ) হয়ে যায়
এবং সেটিই শেষ হুকুম
অর্থাৎ এটি কুরআনের অংশ ছিল না, বরং নাসিখ-মানসুখ হুকুম।
বালিশের নিচে থাকা কাগজ “আয়াত নয়”, বরং একসময়কার হুকুমের নোট।
★কাগজ হারানো = ওহী হারানো নয়
ইসলামের ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের পদ্ধতি ছিল ৩-স্তর:
(১) মুখস্থকারী হাজারো সাহাবী (حفظ)
মুসলিম সেনাবাহিনীতে কুরআন-হাফেজের সংখ্যা ছিল বহু।
(২) লিখিত কপি – বিভিন্ন সাহাবীর কাছে
(৩) নবীর সামনে নিজ মুখে ডিক্টেশন
জিবরাইল (আ.) রমজানে কুরআন সম্পূর্ণ শুনিয়ে দিতেন (عرضة).
তাই একটি ব্যক্তিগত কাগজ নষ্ট হওয়া = শত শত হাফেজের অন্তরের কুরআন মুছে যাওয়া নয়।
একটি উদাহরণ:
আজ আমরা একটি কপি হারালে কি কুরআন হারিয়ে যায়? না — ঠিক তেমনই।
★“সূরা আহযাব ২০০ আয়াত ছিল” — এটি ইতিহাসবিহীন দাবী
কিছু মানুষ বলেন যে:
সূরা আহযাব একসময় ২০০ আয়াত ছিল, এখন ৭৩।
কিন্তু কোনো সহীহ হাদীস, কোনো প্রামাণ্য তাফসীর বা সাহাবীর বিবৃতি নেই যা বলে:
আহযাবে ২০০ আয়াত ছিল
অথবা কুরআন থেকে আয়াত “হারিয়েছে”
বরং:
সমস্ত সহীহ রেওয়ায়েতে সূরা আহযাব = ৭৩ আয়াত।
উসমানী মুসহাফে (সাহাবীদের সম্মতিতে) = ৭৩ আয়াত।
নবী (সাঃ)-এর জীবনকালেই = ৭৩ আয়াত
কোনো সাহাবী—আয়েশা, উমর, আলী, ইবনে আব্বাস—কেউ বলেননি যে কুরআনের আয়াত হারিয়েছে।
★ কুরআন আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে সুরক্ষিত — এবং বাস্তবেই সুরক্ষিত
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
— সূরা হিজর ৯
১৪০০ বছর ধরে:
বানানে একতা
ক্বিরাতের নিয়ম সংরক্ষিত
লক্ষ লক্ষ মুখস্থ
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হিফজ ও লিখিত কপি।
এভাবেই কুরআন সংরক্ষিত আছে।
কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজে নিয়েছেন,প্রশ্নে উল্লেখিত দাবী দ্বারী আল্লাহর দায়ীত্বে অবহেলা প্রমানিত হয়,যাহা কোনো ক্রমেই সহীহ নয়।
তাই “একটি ছাগল খেয়ে ফেলল” — এমন দূর্বল হাদীসের গল্প কুরআনের সংরক্ষণে কোনো প্রভাব ফেলে না।